পাবনা-৩ ও ৪ আসনে বিদ্রোহীর কারণে হার দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর ফসল উঠলো দাঁড়িপাল্লায়
পাবনা প্রতিনিধি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহুল আলোচিত পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে পরাজিত হয়েছেন বিএনপি’র দুই হেভিওয়েট প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন ও হাবিবুর রহমান হাবিব। তাদের পরাজয়ে বিজয়ের ফসল উঠেছে দাঁড়িপাল্লায়। নির্বাচনের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমপি নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাচ্ছেন এই দুই আসনের জামায়াতের বিজয়ী দুই প্রার্থী।
ফলাফল ঘোষণার পর থেকে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আর শক্ত অবস্থানে থেকেও কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেসে টিকতে পারলেন না বিদ্রোহী প্রার্থীরা? অথচ নির্বাচন শুরুর পর থেকে সবারই ধারণা ছিল লড়াই হবে ত্রিমুখী।
চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা নিয়ে পাবনা-৩ আসন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আটজন প্রার্থী। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হন সাবেক এমপি ও চাটমোহর উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি কেএম আনোয়ারুল ইসলাম। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আলী আছগার ১ লাখ ৪৭ গাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ধানের শীষের প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৬ ভোট। আর বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) কেএম আনোয়ারুল ইসলাম ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৩৮ হাজার ২৭ ভোট। আর বাকি পাঁচজন প্রার্থী সবাই মিলে পেয়েছেন ৫ হাজার ৪২০ ভোট। অর্থাৎ ৩ হাজার ২৬৯ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী। এই আসনে বাতিল ভোটের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৮৩। ভোট সংগ্রহের হার শতকরা ৭০.২২ ভাগ। বাতিল ভোটের অর্ধেকও যদি ধানের শীষ পেতো তাহলে ফসল উঠতো তাদের ঘরে।
ভাঙ্গুড়ার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ভাঙ্গুড়ার সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ায় এবং একইসাথে ফরিদপুর উপজেলায় ধানের শীষ জেতার কথা থাকলেও, সেখানে দাঁড়িপাল্লার বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আর চাটমোহরে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েও ধানের শীষের প্রার্থী অন্য দুই উপজেলায় হেরে যাওয়ায় পরাজিত হয়েছেন। আর নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেসে টিকতেই পারেনি ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার। অথচ শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে বিজয়ীর হওয়ার আভাস মিলেছিল সর্বমহলে।
প্রার্থী ও নেতাকর্মী সমর্থকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয়ের প্রধান কারণ বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম। বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলে অনায়াসে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হতেন। দ্বিতীয় কারণ, তার দলের কিছু নেতা নির্বাচনের খরচের টাকা নিয়ে ঠিকমতো কাজ করেননি। তৃতীয় কারণ, দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে নেতাকর্মীরা ছিলেন বিভক্ত।
নিজের পরাজয়ের পেছনে কারণ হিসেবে বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোটের প্রভাব মানতে নারাজ বিএনপি’র প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন। তিনি বলেন, যে কেউ প্রার্থী হতে পারেন, তিনি তার মতো করে ভোট করেছেন। তাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবে প্রশাসনের ভূমিকা সন্তোষজনক ছিল না। আর ভোট কারচুপি করেছে জামায়াত ও ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা তাদের লোকজন। এ জন্য আমি ফলাফল পুনর্গণনার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছি।
আরও পড়ুনএকই চিত্র ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত পাবনা-৪ আসনেও। আসনটিতে বিএনপি’র মনোনয়ন দেওয়া হয় জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবকে। আর দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হন ঈশ্বরদী পৌর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু। এখানেও দলীয় ভোট ভাগাভাগি হওয়ায় টান পড়ে বিএনপি প্রার্থীর ভোটে।
এই সুযোগে ৩ হাজার ৮০১ ভোটে বিজয়ী হন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির আবু তালেব মন্ডল। তিনি পান ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৫ ও হাবিবুর রহমান হাবিব পান ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৪ ভোট। আর স্বতন্ত্র হিসেবে জাকারিয়া পিন্টু পান ২৭ হাজার ৯৭০ ভোট।
এখানে বিদ্রাহী প্রার্থী না থাকলে আসনটি হাতছাড়া হতো না বিএনপি’র। এই আসনে বাতিল ভোটের সংখ্যা ৬ হাজার ৪০৩টি। প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার ৭০.৪৭। পাবনা-৩ আসনের তুহিনের মতো একই ধরনের অভিযোগ এনে হাবিবও পুনরায় ভোট গণনার আবেদন করেছেন নির্বাচন কমিশনে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ফলাফল ঘোষণার রাতে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ভোট গণনায় কারচুপি করা হয়েছে।
পাশাপাশি ঈশ্বরদীর ইউএনও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেননি। তিনি জামায়াত পরিবারের সন্তান হওয়ায় নির্বাচনে সবসময় জামায়াত প্রার্থীর সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। ভোট গণনার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না। তাই পুনরায় ভোট গণনার আবেদন করেছি।
মন্তব্য করুন







