বই পড়ার অভ্যাস কি বিলুপ্তির পথে
জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে বই পাঠের বিকল্প নেই। শিক্ষার্থী কিংবা যে কোনো পেশার শিক্ষিত লোক বই পাঠের ফলে নিজেকে করতে পারে জ্ঞান ভান্ডারের প্রতীক রূপে। এক সময় বই পাঠের আধিক্য ছিল সব জায়গা চোখে পড়ার মত। সময় বদলেছে, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে রুচির পরিবর্তন হয়েছে। হাতের নাগালে প্রযুক্তির উপকরণ থাকাতে সেটা নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত সবাই। জ্ঞান একজন মানুষকে সঠিক আদর্শ ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
এক সময় সন্ধ্যা নামলেই বাড়ির কোণে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বই নিয়ে বসে পড়ার দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। স্কুলের পাঠ্যবই ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, কবিতা কিংবা ভ্রমণকাহিনি-বই ছিল বিনোদন ও জ্ঞানের প্রধান উৎস। আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। হাতে বইয়ের বদলে মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ। প্রশ্ন জাগে-তবে কি বই পড়ার অভ্যাস সত্যিই বিলুপ্তির পথে? ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, অনলাইন গেম কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-সব মিলিয়ে বিনোদনের অসংখ্য বিকল্প এখন হাতের মুঠোয়। মানুষ স্বল্প সময়ে বেশি আনন্দ ও তথ্য পেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। ফলে ধৈর্য নিয়ে দীর্ঘ সময় বই পড়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অফিস, পড়াশোনা, যানজট, অনলাইন চাপ-সব মিলিয়ে অবসরের সময় খুবই সীমিত। ক্লান্ত শরীর ও মন নিয়ে অনেকেই বই খুলে বসার আগ্রহ হারান। সহজ বিনোদন হিসেবে স্ক্রল করা বা ভিডিও দেখা বেশি আরামদায়ক মনে হয়। বই পড়া শুধু বিনোদন নয়, এটি চিন্তার গভীরতা বাড়ায়, ভাষা দক্ষতা উন্নত করে এবং কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে। একটি ভালো বই মানুষকে আত্মবিশ্বাসী, সহানুভূতিশীল ও সচেতন করে তোলে। দ্রুতগতির ডিজিটাল কনটেন্ট যেখানে মনোযোগ ছিন্নভিন্ন করে, সেখানে বই মনকে স্থিরতা ও একাগ্রতা শেখায়। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার ও স্কুলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের হাতে গল্পের বই তুলে দিলে তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। লাইব্রেরি সংস্কৃতি শক্তিশালী করা, পাঠ প্রতিযোগিতা আয়োজন, লেখকদের সঙ্গে মতবিনিময়-এসব উদ্যোগ বইয়ের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে পারে। বই হয়তো রূপ বদলাচ্ছে, কিন্তু গুরুত্ব হারাচ্ছে না। কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল বইও পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আসল প্রয়োজন হলো পড়ার আনন্দটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা। প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করলে বই আবারও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।
বই পড়ার অভ্যাস পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে-এমন বলা ঠিক নয়। তবে এটি নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জের মুখে। সচেতন উদ্যোগ, পারিবারিক অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সহায়তায় বই আবারও মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। কারণ জ্ঞান, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার যে আলো বই ছড়ায়, তা কোনো স্ক্রিনই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
লেখক
আরও পড়ুনমাহফুজা খাতুন
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








