হেনা শিকদার
ধানের জমিতে ইটভাটা এক অশনি সংকেত
বাংলাদেশ, এক কৃষিপ্রধান দেশ, যেখানে সবুজ ধানের ক্ষেত দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত। এই সবুজ কেবল নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা করে না, বরং দেশের কোটি কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়, কৃষকের মুখে হাসি ফোটায় এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই চিরচেনা সবুজ চিত্রপট এক ভয়াবহ আগ্রাসনের শিকার। যত্রতত্র, বিশেষ করে উর্বর ধানের জমিতে, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে অসংখ্য ইটভাটা। এই ইটভাটাগুলো কেবল পরিবেশের মারাত্মক দূষণই ঘটাচ্ছে না, বরং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার মূলে কুঠারাঘাত হানছে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।
কৃষিজমি ও উর্বরতার অপূরণীয় ক্ষতি ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো মাটি। আর ইটভাটার মালিকেরা অল্প দামে বা নামমাত্র মূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কিনে নেন। জমির এই উপরিভাগের মাটিই হলো প্রাণ, যেখানে গাছপালা জন্মানোর জন্য প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান ও পুষ্টি সঞ্চিত থাকে। একবার এই মাটি তুলে নিলে সেই জমি তার উর্বরতা হারিয়ে ফেলে এবং ফসল ফলানোর জন্য প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে, তিন ফসলি জমিও পরিণত হয় এক ফসলি বা অনুর্বর জমিতে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের মোট কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা হারাচ্ছেন তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও তার প্রভাব: ধানের জমিতে স্থাপিত ইটভাটাগুলো পরিবেশের জন্য এক নীরব ঘাতক। এসব ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় থাকে কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস। এই গ্যাসগুলো বাতাসের গুণমান নষ্ট করার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ফসলি জমির ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত: বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাই ধানের পাতার ওপর আস্তরণ তৈরি করে, যা গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ধানের বৃদ্ধি কমে যায়, শীষ পুষ্ট হয় না এবং ধানে চিটার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলন হ্রাস: ইটভাটার উচ্চ তাপমাত্রার কারণে আশপাশের এলাকার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ধানের পরাগায়নকে ব্যাহত করে, ফলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসে সম্পূর্ণ ধানের ক্ষেত পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। মাটি ও পানি দূষণ: ইটভাটার বর্জ্য এবং ছাই বৃষ্টির পানির সাথে মিশে পার্শ্ববর্তী জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে। এই দূষিত পানি সেচের কাজে ব্যবহারের ফলে তা ফসলের জন্য আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে এবং মাটির অম্লত্ব বাড়িয়ে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করে।
খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সরকার এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু কৃষি জমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং এর সাথে নতুন উপদ্রব হিসেবে যুক্ত হয়েছে কৃষি জমিতে স্থাপিত ইটভাটা। বছরে যে পরিমাণ কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ধানের উৎপাদন কমে গেলে চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে এবং দেশকে আবার খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা।
আইনের প্রয়োগ ও বিকল্পের সন্ধান: কৃষি জমি রক্ষায় এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে আইন রয়েছে। ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপন দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অবৈধভাবে এসব ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুনএকইসাথে, আমাদের ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রীর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমানে মাটি না পুড়িয়ে সিমেন্ট, বালু ও পাথরের কুচি দিয়ে তৈরি কংক্রিট ব্লক বা হলো ব্লক ইটের উত্তম বিকল্প হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই ব্লক ব্যবহারে একদিকে যেমন কৃষি জমি রক্ষা পাবে, তেমনি পরিবেশ দূষণও রোধ করা সম্ভব হবে। সরকারকে পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করতে হবে এবং এর ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে।
খাদ্যের অধিকার মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত হলো কৃষি ও কৃষককে বাঁচিয়ে রাখা। ধানের জমিতে ইটভাটার আগ্রাসন আমাদের কৃষি, পরিবেশ এবং সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তাকে এক ভয়াবহ হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকট উত্তরণে সরকার, প্রশাসন, পরিবেশবিদ, কৃষক এবং সাধারণ জনগণসহ সকল পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষি জমিতে ইটভাটা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প নির্মাণ প্রযুক্তির বহুল প্রচলন ঘটাতে হবে। সবুজ ধানের ক্ষেতকে রক্ষা করার মাধ্যমেই আমরা আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি ক্ষুধামুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারি। সময় থাকতেই আমাদের জাগ্রত হতে হবে, নতুবা উন্নয়নের নামে আমরা আমাদের অস্তিত্বের সংকট ডেকে আনব।
লেখক : শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1793088500.jpg)
_medium_1793079176.jpg)
_medium_1793007062.jpg)
_medium_1792994112.jpg)
_medium_1792909942.jpg)
_medium_1792823374.jpg)


