প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৪২ পিএম
৮ ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধাসহ রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে স্টোরেজ ব্যবস্থা জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রকল্পটিতে আট ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধা যুক্ত করা হবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) একনেক সভা শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যাটারি সংরক্ষণের এমন ব্যবস্থা ছিল না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে আট ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধা যুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, মূল প্রস্তাবে একটি সম্পূরক ব্যবস্থার আওতায় চার ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজের পরিকল্পনা ছিল। তবে একনেক বৈঠকে আলাদা কোনো সম্পূরক প্রকল্প না নিয়ে মূল ডিপিপিতেই আট ঘণ্টার স্টোরেজ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাকি বলেন, ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধা বাড়ানোর ফলে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে। প্রাথমিকভাবে ব্যাটারি স্টোরেজ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। আট ঘণ্টার স্টোরেজ যুক্ত করার পর সংশোধিত ব্যয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নতুন করে হিসাব করার পর ইউনিটপ্রতি চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত স্টোরেজ ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক ব্যয় বাড়লেও এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে প্রয়োজনের সময় সরবরাহ করা যাবে। এমনকি রাতের বেলাতেও সংরক্ষিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। পরিকল্পিত দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ এগোয়নি। ফলে উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত করা বিপুল পরিমাণ জমি অব্যবহৃত রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ইতোমধ্যে প্রায় ৬৮৫ একর জমি ভরাট করেছে। এখন ওই প্রস্তুত করা জমি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাকি বলেন, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত করা জমি ব্যবহার করা হবে বলে নতুন করে কোনো জায়গার প্রয়োজন হবে না। তবে রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্যায়ন ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের পরিবেশগত শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ‘সবুজ’ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পকে লাল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ডিপিপি প্রণয়নের পর্যায়েই পরিবেশগত বিষয়সহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে সরকার নতুন একটি নীতিকাঠামো প্রণয়নের কাজ করছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রায় ১০ থেকে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে। এসব বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদনও ডিপিপির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, নতুন নীতিমালায় পরিবেশগত বিষয়গুলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।
একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে সাকি বলেন, কয়েকটি প্রকল্প নির্দিষ্ট কিছু শর্ত বাস্তবায়নের ভিত্তিতে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে সংশোধিত প্রস্তাব আবার একনেকে উপস্থাপন করতে হবে।
অবকাঠামোর গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে তিনি বলেন, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে সড়ক বা অন্য কোনো অবকাঠামোয় বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারকে তা মেরামত করতে হবে।
এ জন্য চুক্তিনামায় যথাযথ গ্যারান্টি ও ওয়ারেন্টির ধারা যুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি। নির্মাণের তিন বছরের মধ্যে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারকেই সংশ্লিষ্ট সড়ক বা অবকাঠামো মেরামত করতে হবে।
জনবসতিপূর্ণ এলাকার সড়কে বাধ্যতামূলকভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থা গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। জমে থাকা বৃষ্টির পানি সড়কের পৃষ্ঠ নষ্ট করে। তাই জনবসতিপূর্ণ এলাকার সড়ক প্রকল্পে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছাড়া কোনো সড়ক পরিকল্পনা করা হবে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি এলাকার ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পে দুই বছরের মধ্যে একটি পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে একনেক।
সাকি বলেন, প্রকল্পের সঙ্গে এসটিপি ও সংযোগকারী পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি নদীতে গিয়ে না পড়ে।
তিনি জানান, সরকার ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকল্পগুলোর প্রস্তুতির কাজ অনেক আগে শুরু হয়েছিল। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ডিপিপি প্রস্তুত করতে যথেষ্ট সময় লাগে। নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরুর অনেক আগেই গত ১৮ মে প্রস্তাবগুলো সরকারের ‘গ্রিন পেজে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রকল্প নিয়ে সাকি বলেন, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। এসব এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। অন্য একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যমান সড়ক পুনর্বাসন করা হবে।
একনেক রংপুরের এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে রংপুর জেলার জন্য প্রস্তুত করা মাস্টারপ্ল্যান এবং সিটি করপোরেশনের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করার নির্দেশ দিয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত নিজস্ব জনবল থাকলে পরামর্শক খাতে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে যানবাহন কেনার একটি প্রস্তাব সরকার কর্তৃক যানবাহন কেনার ওপর জারি করা সাধারণ বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় বাতিল করা হয়েছে।
পঞ্চগড় শহরের চারপাশে বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশোধিত অর্থবছরভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়সূচি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
সাকি বলেন, প্রকল্পের গুণগত মান, পরিবেশগত বিধিবিধান পরিপালন, যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সংশ্লিষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করতে সরকার ভবিষ্যতেও প্রকল্পের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করবে।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক





