ভিডিও সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৩৭ পিএম

বগুড়ায় বেপরোয়া ‘কিশোর গ্যাং’ কলেজ ছাত্রী ছুরিকাহত, গ্রেফতার

বগুড়ায় বেপরোয়া ‘কিশোর গ্যাং’ কলেজ ছাত্রী ছুরিকাহত, গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’। মহানগরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথাসহ বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেল নিয়ে বিকট শব্দে মহড়া দিয়ে ‘হিরোগিরি’ করার পাশাপাশি নানা অপরাধ কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে পড়েছে কিশোর গ্যাং এর সদস্যরা। খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, দস্যূতা, চুরি, ছুরিকাঘাত, স্কুল-কলেজ গামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, মাদক কেনা-বেচা, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধ করে যাচ্ছে এই কিশোররা।

উল্লেখ্য, গত ৪ অক্টোবর রোববার দুপুরে সাইদা রাইসা লাবিবা (১৭) নামে এক কলেজ ছাত্রী  জলেশ্বরীতলায় কিশোর গ্যাং এর কবলে পড়েন। এসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য উদ্ভাস কোচিং সেন্টারে যাচ্ছিলেন। পথে কিশোর গ্যাং এর লিডার রেজওয়ানুল হাসান রাতুল ও তার ২/৩ জন সহযোগী তাকে উত্ত্যক্ত করে। একপর্যায়ে  রাতুল তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়।

এসময় মেয়েটি তার প্রস্তাবে রাজি না হলে রোববার বেলা দেড়টার দিকে ডক্টরস ক্লিনিক-১ এর গলি দিয়ে উদ্ভাস কোচিং সেন্টারে যাওয়ার পথে রাতুল (১৮), কিশোর সিনান রহমান স্বপ্নীল (১৫), কিশোর নূরে মোজাচ্ছেম কাইফ (১৬) তার পথরোধ করে দাঁড়ায় এবং জোরপূর্বক তাকে রিকশা হতে নামিয়ে অপহরণ করে রাতুলের মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে সুত্রাপুর মফিজপাগলা মোড়ের দিকে যাচ্ছিল।

এসময় মেয়েটি চিৎকার শুরু করলে রাতুল ও তার সহযোগী স্বপ্নীল, কাইফহ আরো ২-৩ জন তাকে কিল, ঘুষি ও মারধর করে। এতে মেয়েটি রাস্তায় পড়ে গেলে রাতুল মেয়েটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার মাথায় ছুরিকাঘাত করে। তখন লোকজন মেয়েকে উদ্ধার করে ডক্টরস ক্লিনিকে নিয়ে যায় এবং মোবাইল ফোনে তার বাবাকে ঘটনাটি জানায়। সংবাদ পেয়ে তার বাবা তাৎক্ষণিক ডক্টরস ক্লিনিকে এসে তার মেয়ের মারাত্মক অবস্থা দেখতে পান।

পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এঘটনায় ডিবি পুলিশ হামলাকারী কিশোর রাতুল, তার দুই সহযোগী স্বপ্নীল ও কাইফকে গ্রেফতার করে। গতকাল রোববার বিকেলে সাড়ে ৫ টার দিকে ডিবির এসআই শামীম আহমেদের নেতৃত্বে ডিবির একটি টিম অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি রাতুলকে মহানগরের বনানী থেকে, রাত সাড়ে ৯ টার দিকে সুত্রাপুর থেকে স্বপ্নীলকে ও রাত ১০ টার দিকে মহানগরের জেলখানা মোড়ে কাইফকে গ্রেফতার করে। আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) গ্রেফতার এই তিন কিশোরকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

এঘটনায় মেয়েটির বাবা সাইদ-উল হক তিনজনের নামসহ অজ্ঞাত কয়েকজনের নামে মামলা করেন। এর আগে গত ৩ অক্টাবর শনিবার রাতে মহানগরের জলেশ্বরীতলায় অর্ধ শতাধিক কিশোরদের দুই গ্রুপের মধ্যে মারপিটের ঘটনা ঘটে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতংক দেখা দেয় শুধু ছুরিকাঘাতের ঘটনাই নয়, কিশোর গ্যাং এর হাতে মানুষও খুন হচ্ছে। চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল মহানগরের শাকপালায় স্কুল শিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে কিশোর গ্যাং এর হাতে নিহত হয় সে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মহানগরের জলেশ্বরীতলা, মালতিনগর, ভাটকান্দি, লতিফপুর কলোনী, সূত্রাপুর ফেনালিপাড়া খান্দার শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামের পিছনে, সেউজগাড়ী, মালগ্রাম, চেলোপাড়া, উত্তর চেলোপাড়া, নারুলি, নাটাইপাড়া, চকসুত্রাপুর, চামড়া গুদাম লেন, বাদুড়তলা, রহমান নগর, সুলতানগঞ্জপাড়া, জামিলনগর, মাটিডালি বিমান মোড়, ফুলবাড়ি, ফুলতলা, পুরান বগুড়া, কামারগাড়ী, উপ-শহর, নিশিন্দারা, নামাজগড়, বৃন্দাবনপাড়া, বনানী, পুরনো শিল্পকলা একাডেমি, মহিলা ক্লাব, মুক্তির ফুলবাড়ি, দ্বিতীয় বাইপাস সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোর গাং এর দাপট রয়েছে।

এছাড়া জেলার ১৩টি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জেও এদের দাপট বাড়ছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেন, মহানগর থেকে গ্রামাঞ্চলে এখন আতঙ্কের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের নিয়ে গড়ে ওঠা এসব চক্র শুরুতে গলির মোড়ে আড্ডা, ইভটিজিং বা তুচ্ছ বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা সংঘবদ্ধ ও মারাত্মক অপরাধমূলক সিন্ডিকেটে রূপ নিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার, সঠিক পারিবারিক তদারকির অভাব, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং স্থানীয় অপরাধী বা ‘বড় ভাই’দের প্ররোচনায় কিশোরদের একটি অংশ এখন অস্ত্রের মহড়া, দখলদারি, চাঁদাবাজি, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

গ্যাংগুলোর মধ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মোটরসাইকেলের মহড়া, সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য সামাজিক মাধ্যমে (যেমন: টিকটক, ফেসবুক) ভিডিও তৈরি, মাদকসেবন ও ব্যবসা, কিশোরী বা তরুণীদের হেনস্থা, এবং অস্ত্র প্রদর্শন সামান্য বাগবিতন্ডা বা হিরোইজম দেখাতে গিয়ে এরা ধারালো অস্ত্র চাপাতি, সামুরাই, সুইস গিয়ার, ক্ষুর ব্যবহার করে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাং বৃদ্ধির মূল কারণসমূহ কিশোর অপরাধের এই বিস্তার হঠাৎ করে ঘটেনি। এর পেছনে রয়েছে একাধিক জটিল মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক কারণ পারিবারিক তদারকির শিথিলতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়।

আরও পড়ুন

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনো বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবু সায়েম বলেন, পরিবারে বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা, সুসম্পর্কের অভাব এবং পারিবারিক জবাবদিহিতা কমে যাওয়া কিশোরদের একা করে ফেলে। অভিভাবকরা প্রায়শই জানতে পারেন না যে তাদের সন্তান কার সাথে চলাফেরা করছে বা বাইরে সময় কীভাবে কাটাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল সংস্কৃতি ফেসবুক, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে কিশোররা একধরণের ভুয়া জনপ্রিয়তা বা 'হিরোইজম' পাওয়ার চেষ্টা করে। গ্যাংগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট কোড নাম, ভিডিও বানিয়ে অস্ত্র প্রদর্শন এবং অন্যদের ভয় দেখিয়ে লাইক-ভিউ পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে।

কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো স্থানীয় অপরাধী ও স্বার্থান্বেষী মহল, যাদের কিশোররা ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করে। রাজনৈতিক মহড়া, মিছিল-মিটিং, দখলদারি বা এলাকা ভিত্তিক আধিপত্যে কম খরচে ব্যবহারের জন্য এসব কিশোরকে অস্ত্র ও মাদক দিয়ে অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, শহরাঞ্চলে খেলার মাঠের চরম সংকট, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভাব এবং অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ কিশোরদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে তারা বিকল্প হিসেবে গ্যাং সংস্কৃতি ও নেতিবাচক আড্ডার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেন,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়শই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অনেককে গ্রেফতার করে। তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। অপরাধীদের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় সাধারণ আইনে তাদের শাস্তি দেওয়া যায় না। তাদের জাতীয় কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে (যেমন: টঙ্গী, যশোর, গাজীপুর) পাঠাতে হয়। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।

এছাড়া পর্যাপ্ত আইনি প্রক্রিয়ার পর কিশোররা জামিনে বের হয়ে এসে আবার একই ‘বড় ভাই’ ও গ্যাংয়ের চক্রে ফিরে যায়, কারণ তাদের পুনর্বাসনের টেকসই কোনো কাঠামো নেই। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির কারণে সমাজে এক ধরণের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ,বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রতিনিয়ত এক ধরণের আতঙ্কে থাকেন।

বিশ্লেষকরা বলেন, কিশোর গ্যাং সমস্যাটি কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। আজ যারা গ্যাং সংস্কৃতির শিকার, তারা দেশের ভবিষ্যত নাগরিক। তাই এদের দমন করার পাশাপাশি অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে শুধরে দেওয়া আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে দ্রুত ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করার। বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি ও অভিযান চালানো হচ্ছে।

কিশোর গ্যাং এর  তালিকা তৈরি করে অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে বেশ কয়েকজন কিশোরকে। উদ্ধার করা হচ্ছে বার্মিজ চাকুসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্রও। তিনি বলেন কিশোর গ্যাং এর বিরুদ্ধে পুলিশের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ায় বেপরোয়া ‘কিশোর গ্যাং’ কলেজ ছাত্রী ছুরিকাহত, গ্রেফতার

১

সেলস ম্যানেজার নিয়োগ দেবে স্কয়ার ফুড, লাগবে স্নাতক পাস

২

নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. হাছানাত ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মনোনীত

৩

বগুড়া কারাগারের হাজতি আসামি মালেকের মৃত্যু

৪

বগুড়ার আদমদীঘিতে নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলায় সাবেক মেম্বারসহ ৯ জন গ্রেফতার

৫

দুর্গাপূজায় দোকানপাট খোলা থাকবে রাত ১০টা পর্যন্ত

৬