মূল্যস্ফীতি নিয়ে শঙ্কা এডিবি’র
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাঝারি মাত্রায় ঘুরে দাঁড়াবে। এই সময় ৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। তবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশ হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফিরলেও দেশের পুনরুদ্ধার এখনো বহিরাগত ধাক্কা এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এডিবি বলছে, ২০২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা ধীর হয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। তবে এ প্রভাব সীমিত থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। অন্যদিকে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসায় অর্থনীতিতে ভোগ ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ কারণে আগামী অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি।
এডিবি’র বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে শুরু করেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার বহিরাগত ধাক্কা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সংস্কার ত্বরান্বিত করার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এসব সংস্কার বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল প্রবৃদ্ধির পথে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ এসব সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছে এডিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে তারা।
মূল্যস্ফীতি কমলেও আবার বাড়ার পূর্বাভাস: বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ অর্থবছরে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা কিছুটা কমে আনুমানিক ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। ২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য নৌপরিবহন বিঘ্নের কারণে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এর সঙ্গে এল নিনোর বিলম্বিত প্রভাব খাদ্যপণ্যের বাজারেও চাপ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে মুদ্রানীতি শিথিল হওয়ার কারণেও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুনরেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি, বাড়তে পারে চলতি হিসাবের ঘাটতি : ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ০ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে ০ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। আমদানি বৃদ্ধির হার রপ্তানি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে এডিবি। অর্থনীতিতে আমদানির চাহিদা বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির জায়গাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যেও বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকার প্রত্যাশা করছে এডিবি। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি দেশের বহিরাগত স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত আর্থিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, বিনিময় হারকে নমনীয় রাখা এবং বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে জানিয়েছে এডিবি।
কৃষি ও সেবা খাতের ওপর ভর করবে প্রবৃদ্ধি : ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষি ও সেবা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে এডিবি। এসব খাতে কার্যক্রম বাড়ার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা গতি আসতে পারে। তবে শিল্প খাত এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। উচ্চ ঋণ ব্যয়, ঋণের সীমিত প্রাপ্যতা, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক চাহিদা দুর্বল থাকা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরেও ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক হিসেবে থাকবে। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভোগব্যয়কে সমর্থন করবে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে ভোগব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি দামের ঝুঁকি : বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় বহিরাগত ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে দেখছে এডিবি। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নৌপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন করে বিঘ্ন দেখা দিলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর অব্যাহত চাপ, ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া, আর্থিক ও রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব এবং প্রত্যাশার তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়াও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন অভিঘাতও অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে এডিবি। বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা এলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি কমে যেতে পারে।
সংস্কার বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে এডিবি : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পথও সহজ হবে। এডিবি মনে করছে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার শুরু হলেও তা এখনো পুরোপুরি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে দেশের অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1790147347.jpg)
_medium_1790144860.jpg)
_medium_1790143598.jpg)
_medium_1790140977.jpg)
_original_1789018053_original_1789446627_original_1789534493_original_1789796238_original_1789879740_original_1789972098_medium_1790138845.jpg)


_medium_1790145570.jpg)
