ভিডিও বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩২ পিএম

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার

ময়নাতদন্তে মা-মেয়ের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ, ধর্ষণের আলামত মেলেনি

ময়নাতদন্তে মা-মেয়ের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ, ধর্ষণের আলামত মেলেনি

রংপুর প্রতিনিধি : রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে দেওয়া দুই আসামির জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। 

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠার পর ভোরে তাদের দেখে ফেলেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রথমে তাকে এবং পরে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে যায় তারা।

ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত মেলেনি:

নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহের ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তে দুজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলিশ বলছে, আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।

জমি নিয়ে পুরোনো সম্পর্ক, পাশের বাড়ির বাসিন্দা আসামি:

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সীমান্ত দাস জানিয়েছেন, তিনি একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। অপর আসামি সিদ্ধার্থ দাস স্বর্ণের দোকানের কারিগর। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে সিদ্ধার্থদের বাড়ি লাগোয়া। যে জমিতে গণপতি চক্রবর্তী বাড়ি করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের জমি ছিল। পরে গণপতি চক্রবর্তী ওই জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন।

ঘটনার আগে নিয়মিত ইয়াবা সেবন:

সিদ্ধার্থ দাসের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ইয়াবা সেবন করতেন। ঘটনার দিন রাতে তিনি মুগ্ধ দাসকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা নেওয়ার জন্য তারা শান্ত নামে এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তার বাড়ির সামনে থেকে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ইয়াবা ব্যবসায়ীর পরিচয় তারা পেয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবা, পরে নেওয়া হয় ১৫ হাজার টাকা:

জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ইয়াবা কেনার সময় তারা মোবাইল ফোন বন্ধক রেখেছিলেন। পরে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে সিদ্ধার্থের ভাগে পড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে তিনি বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। ইয়াবা সেবনের পর রাত ৩টার দিকে তারা সীমান্তদের বাসা থেকে বের হন। রাস্তায় কুকুর থাকায় সরাসরি না গিয়ে তারা দেয়াল টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন।

দুই ছাদের দূরত্ব ছিল মাত্র আড়াই ফুট:

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেবুদের বাড়ির ছাদ ছিল খোলা। সেখান থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার সুযোগ ছিল। দুই ছাদের দূরত্ব ছিল আনুমানিক দুই থেকে আড়াই ফুট। গণপতি চক্রবর্তীর ছাদের চারপাশে হাফওয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। তারা পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন শুরু করেন। সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। অন্যদিকে মুগ্ধের জবানবন্দিতে নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা বলা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, আটটি ইয়াবা একসঙ্গে এবং পরে আরও একটি সেবনের কারণে এই পার্থক্য হতে পারে। দুই আসামিই জানিয়েছেন, জীবনে এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
ভোরে দেখে ফেলেন গণপতি চক্রবর্তী

ইয়াবা সেবন করতে করতে তারা খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখতে পান। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী তাদের ধমক দিয়ে জানতে চান, এত সকালে তারা সেখানে কী করছেন। এতে আসামিরা ভয় পেয়ে যান। তারা আশঙ্কা করেন, শিক্ষক চিৎকার করলে বিষয়টি সবাই জেনে যাবে। একই সঙ্গে মান-সম্মানের ভয় থেকেও তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দেন। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দুই দিক থেকে গামছা টান দিলে একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।

শব্দ শুনে ছাদে আসেন স্ত্রী ও মেয়ে:

আরও পড়ুন

গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে চলে আসেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ প্রীতিলতার গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তীর গলা চেপে ধরেন। একপর্যায়ে তারা দুজনও মারা যান। পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় এক নারী ওই সময় চিৎকারের শব্দ শুনেছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানানোর পর বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার আগেই তার স্বামী তাকে মারধর করেন বলেও জানা গেছে।

শিশুটি চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা:

এরপর আসামিরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানো। দোতলায় গিয়ে ঘরের জিনিসপত্র ও আলমারি এলোমেলো করার সময় তারা দেখতে পান, পরিবারের এক শিশু ঘুম থেকে উঠেছে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং তার নাম ধরে ডাকে। জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশুটি চিৎকার করে আশপাশের মানুষকে জানিয়ে দিতে পারে এই আশঙ্কায় তারা তাকে বিছানায় ফেলে গলায় কাপড় বা পেটিকোট পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

সিসিটিভি'র আশঙ্কায় বিদ্যুতের তার কাটে:

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে-এমন আশঙ্কায় আসামিরা নিচতলায় গিয়ে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। তাদের ধারণা ছিল, এতে কোনো সিসিটিভি থাকলেও সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর তারা আবার ওপরের দিকে যান এবং ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করেন।

স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়:

হত্যার পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে তারা ঘরের ড্রয়ার, আলমারি ও অন্যান্য জিনিসপত্র তছনছ করেন। কিছু স্বর্ণালংকার এবং ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান। জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা আবার ছাদে ওঠেন। সেখান থেকে পাশের দেবুদের বাড়ির ছাদে গিয়ে দেয়াল টপকে বাইরে বেরিয়ে যান। সিদ্ধার্থ স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে একটি গলিতে চলে যান। পরে পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে সেগুলো পুঁতে রাখেন। পুলিশ বলছে, বিজয় কাকা ও পূর্ণিমা কাকি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

ঘটনার পরও স্বাভাবিকভাবে কাজে যান সিদ্ধার্থ:

ঘটনার পর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে গোসল করেন। পরে মুগ্ধের কাছ থেকে তার ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেন এবং সেই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন তিনি স্বাভাবিকভাবে স্বর্ণের দোকানে কাজে যান। অন্যদিকে মুগ্ধ নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন। পরে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।

আদালতের জবানবন্দিতে মিল:

পুলিশ কমিশনার বলেন, সীমান্ত দাসের ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বক্তব্যে ঘটনার মূল বর্ণনায় বেশকিছু মিল রয়েছে। বিশেষ করে ইয়াবা সেবনের জন্য ছাদে যাওয়া, গণপতি চক্রবর্তীর হাতে ধরা পড়া, এরপর একে একে পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা-এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্যে সামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। তবে ইয়াবা সেবনের সংখ্যা নিয়ে দুই আসামির জবানবন্দিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যও তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা দেখে বা শুনে থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ময়নাতদন্তে মা-মেয়ের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ, ধর্ষণের আলামত মেলেনি

নেপালে আকস্মিক বন্যার নেপথ্যে কী?

যন্ত্রাংশের নামে ৭ কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি

এমবাপ্পের হ্যাটট্রিকে বড় জয় রিয়াল মাদ্রিদের

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের বৈঠক

জাতীয় কবির সমাধিতে ঢাবি ছাত্রদলের শ্রদ্ধা নিবেদন