ভিডিও শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৩ পিএম

ত্বক ফর্সা হওয়ার ক্রিমে বিষাক্ত পারদ, সৌন্দর্যের আড়ালে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নারীরা

ত্বক ফর্সা হওয়ার ক্রিমে বিষাক্ত পারদ, সৌন্দর্যের আড়ালে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নারীরা

স্টাফ রিপোর্টার : ত্বকের রঙ দ্রুত উজ্জ্বল ও ফর্সা করার প্রলোভন দেখিয়ে বাজারে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার নানা ধরনের ‘ফেয়ারনেস’ বা স্কিন লাইটেনিং ক্রিম। কিন্তু এসব ক্রিমের আড়ালে লুকিয়ে আছে অতিমাত্রায় বিষাক্ত ‘পারদ’ (মার্কারি), হাইড্রোকুইনোন।

সরকারি মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (বিএসটিআই) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রসাধনীতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি পারদযুক্ত ক্রিম ব্যবহারে ত্বকের স্থায়ী ক্ষতির পাশাপাশি ক্যান্সার, কিডনি অকেজো, লিভারের ক্ষতি ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

সারাদেশের মত বগুড়ার নিউ মার্কেট, বিপনী বিতান, চুড়িপট্টিসহ পাড়া-মহল্লার কিছু কিছু দোকানে বিদেশি এবং স্থানীয় কোম্পানির নিষিদ্ধ রঙ ফর্সাকারী ক্রিম বিক্রি হচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে গত বৃহস্পতিবার বগুড়ার নিউ মার্কেটে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান পরিচালনা করে একটি দোকানে এসব প্রসাধনী পাওয়ায় জরিমানাও করা হয়।

বিএসটিআই’র বিভিন্ন সময়ে নমুনা পরীক্ষায় বাজারের বেশ কয়েকটি নামীদামী স্কিন লাইটেনিং ক্রিমে বিপজ্জনক মাত্রায় পারদের উপস্থিতি ধরা পড়ে। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বিপজ্জনক মাত্রায় ক্ষতিকর পারদের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় আটটি ব্র্যান্ডের ত্বক ফরসাকারী ক্রিম বিক্রি-বিতরণ, মজুত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে বিএসটিআই।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এসব ক্রিম ব্যবহার ও আমদানী নিষিদ্ধ করে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন বিএসটিআই এর সম্পাদক মঈনুদ্দীন মিয়া। ওই আটটি ক্রিমের সাতটি পাকিস্তানের ক্রিম ও একটি চীনের।

ক্রিমগুলো হলো-পাকিস্তানের এসজে এন্টারপ্রাইজের চাঁদনি হোয়াইটেনিং ক্রিম, কিউসিআই কোম্পানির নিউ ফেস বিউটি ক্রিম, লোয়া ইন্টারন্যাশনালের নিভিয়া বিউটি ক্রিম ও নিভিয়া হোয়াইটেনিং ক্রিম, নুর এন্টারপ্রাইজের নুর হোয়াইটেনিং ক্রিম, ক্রিয়েটিভ কসমেটিকসের ডিউ বিউটি ক্রিম, গোরি কসমেটিকস প্রাইভেট লিমিটেডের গোরি বিউটি ক্রিম এবং চায়না জিএলডিজেবি (হারবিন) কসমেটিকসের ন্যাচারাল পার্ল স্ক্রিন ক্রিম।

এ বিষয় নিয়ে কথা বললে, প্রখ্যাত এ্যালার্জী, চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা এ.জেড এম মাইদুল ইসলাম জানান : ব্রণ, মেছতা, কালো দাগ বা যেকোনো ত্বকের সমস্যায় নিজের ইচ্ছায় অননুমোদিত ফর্সাকারী ক্রিম না কিনে সরাসরি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ক্রিম ব্যবহার করা উচিত।

বর্তমানে অসাধু ব্যবসায়িক স্বার্থে যেসব রঙ ফর্সাকারী  ক্রিম ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে পারদ, হাইড্রোকুইনোন ব্যবহার করা হয়। এটি সাময়িকভাবে ত্বককে একটু ব্লিচ করে ফর্সা ভাব আনে। কিন্তু এর লং টার্ম ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে, যা শুধু চামড়ার ওপরই নয়, পুরো শরীরে পড়ে। চামরা পাতলা হয়ে যায়, রোদে বের হলে জালা-পোড়া করে। দীর্ঘদিন এটা  ব্যবহার করলে রক্তে পারদের ঘনত্ব বেড়ে গেলে এটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে কিডনিতে। এছাড়া পরোক্ষভাবে ক্যান্সার, লিভার এবং শরীরের অন্যান্য ভাইটাল অর্গানগুলোতেও ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে।

আরও পড়ুন

‘বিএসটিআই ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রসাধনী সামগ্রীতে পারদের অনুমোদিত সর্বোচ্চ মাত্রা ১ পিপিএম, অথচ ২০২০ সালে বিএসটিআই ১৩টি ক্রিমের নমুনা পরীক্ষা করে ৮টিতে ১৯৩ পিপিএম থেকে ৯৪৮ পিপিএম পর্যন্ত বিষাক্ত পারদ ও ক্ষতিকর হাইড্রোকুইনোন শনাক্ত করে সেগুলোর বিক্রি নিষিদ্ধ করেছিল।

সম্প্রতি পরিচালিত বিএসটিআই-এর পরীক্ষায়ও বাজারের আরও ৮টি ব্র্যান্ডের ক্রিমে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি পারদ পাওয়া গেছে। এমনই একজন ভুক্তভোগী বগুড়ার কলোনী এলাকার গৃহবধূ লামিয়া সুলতানা (ছদ্মনাম) বয়স ৩৫।

তিনি জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে আমি গত বছর একটি বিদেশি ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার শুরু করি। ১৫ দিনের মধ্যেই মুখ বেশ ফর্সা ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু তিন মাস পর হঠাৎ ক্রিমটি ব্যবহার বন্ধ করতেই মুখের চামড়া লাল হয়ে প্রচণ্ড জ্বালা-পোড়া শুরু হয়।

রোদ বা চুলার কাছে গেলে মনে হতো মুখ পুড়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে মুখে বিশ্রী কালো ছোপ ছোপ দাগ এবং অতিরিক্ত ব্রণ দেখা দেয়। পরে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানোর পর তিনি জানান, ক্ষতিকর রাসায়নিক ও পারদের কারণে আমার ত্বকের উপরিভাগ সম্পূর্ণ পাতলা হয়ে গেছে এবং রক্তে পারদের বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমাকে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

বিএসটিআইয়ের দাবি, দেশি বাজারে বিভিন্ন রং ফর্সাকারী ক্রিম পাওয়া যাচ্ছে। এসব পণ্য বৈধভাবে আমদানি করা হচ্ছে না। লাগেজ বা বিভিন্ন চোরাইপথে দেশের বাজারে এসব পণ্য প্রবেশ করছে ও বিক্রি হচ্ছে। ফলে বিএসটিআই চোরাই পথে আসা এসব পণ্যের মান যাচাই করতে পারছে না। বাজার থেকে সংগ্রহ করা এমন রং ফর্সাকারী ক্রিম বিএসটিআই ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে বিএসটিআই।

বিএসটিআই আঞ্চলিক অফিস বগুড়ার সহকারী পরিচালক মো: দেলোয়ার হোসেন (সিএম) বলেন, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে এধরণের কাজ যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি করছে তাদের প্রতিহত করতে জনসচেতণতা দরকার। যেকোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত প্রসাধনী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএসটিআই দেশের বাজারকে নিরাপদ রাখতে বাজারে আসা এসব সামগ্রী বা পণ্যের নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ, বাজার তদারকি এবং মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম চলমান রেখেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ত্বক ফর্সা হওয়ার ক্রিমে বিষাক্ত পারদ, সৌন্দর্যের আড়ালে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নারীরা

নওগাঁর মহাদেবপুরে পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এলাকাবাসী

লালমনিরহাটে শিক্ষক হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

বগুড়ার শেরপুরে পাখির বাসা ডিম ও ছানা ধ্বংস মামলার আসামি গ্রেফতর

জয়পুরহাটে মিটার রিডারকে মারধর, উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনের কাছে চিঠি

বগুড়ার সোনাতলায় শতভাগ পাশ করা প্রতিষ্ঠানে ২২ বছরেও হয়নি একাডেমিক ভবন