অন্যতম কারণ বাল্য বিয়ে
বগুড়ায় আড়াই বছরে ৩০ হাজারের বেশি তালাক, দিনে ঘর ভাঙছে ৩২টি
স্টাফ রিপোর্টার : মাত্র তের বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল সেবা’র (ছদ্মনাম)। আর কুড়ি না পেরোতেই তাকে করতে হলো তালাকের আবেদন। বগুড়া শহরেই নানীর কাছে বেড়ে ওঠছিলো সেবা। কিন্তু কৈশোর পার হওয়ার আগেই নানী তাকে পার্শ্ববর্তী গাবতলী উপজেলার নাড়ুয়ামালা গ্রামে বিয়ে দেন। বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় যৌতুকের জন্য স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির নির্মম নির্যাতন।
এর মধ্যেই তার কোলজুড়ে আসে একটি কন্যা সন্তান। কিন্তু সন্তানের জন্মের পর নির্যাতনের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে স্বামীর বাড়ির অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সেবা আবার নানীর কাছে ফিরে আসেন। দীর্ঘ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার পর অবশেষে জীবন বাঁচাতে সেবা’র পরিবার থেকে তালাকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাল্য বিয়ের আরেক শিকার বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার রাবেয়া (ছদ্মনাম)। কিশোরী বয়সেই তার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল একই গ্রামের সজীবের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই নানা অজুহাতে রাবেয়া’র ওপর চলতো স্বামীর নির্মম মারধর ও শারীরিক নির্যাতন। কোনোভাবেই নির্যাতন বন্ধ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটি গিয়ে দাঁড়ায় তালাকে।
গত ২৪ জুন মাত্র ৮০ হাজার টাকা খোরপোশ দিয়ে সজীব রাবেয়াকে তালাক দেন। একই করুণ পরিণতি ঘটেছে গাবতলী উপজেলার টুম্পার (ছদ্মনাম) জীবনে। বাল্যবিয়ের শিকার টুম্পাকে গত ৩ জুলাই মাত্র ৫০ হাজার টাকা খোরপোশ দিয়ে তালাক দেন তার স্বামী বগুড়া সদর উপজেলার শিমুল। খোরপোশের নামমাত্র কিছু টাকা দিয়ে এভাবে প্রতি নিয়ত শত শত কিশোরীর বৈবাহিক জীবনের করুণ সমাপ্তি ঘটছে বগুড়ায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকে ভুয়া জন্ম সনদ তৈরি করে অথবা কাজী ছাড়া রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ে সম্পাদন করছে। অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে কিছুদিনের মধ্যেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র মতের অমিল দেখা দিচ্ছে। এছাড়া স্বামীদের মাদকাসক্তি, জুয়া খেলা, পরকীয়া সম্পর্ক এবং যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে তালাক বেশি হচ্ছে।
বগুড়ার শাজাহানপুরে বাল্যবিয়ে এবং তালাক নিয়ে কাজ করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারী সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার জানান, ওই উপজেলার একটি ইউনিয়নেই এক মাসে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ৩১টি। মূলত কিশোরী বয়সে বিয়ে এবং রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ের কারণে তালাকের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া তালাকের সময় কন্যা পক্ষকে তেমন খোরপোশও দেওয়া হয় না।
কিছু কিছু তালাকতো মৌখিকভাবেও দেওয়া হয়। নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি আইনজীবী সংস্থার প্রতিনিধি এড. শারদী শবনম মিথুন জানান, অপরিণত বয়সে মেয়েদের বিয়ের কারণে তালাকের হার বাড়ছে। শহরের তুলনায় গ্রামে এই সংখ্যা বেশি। আইনের চোখ ফাঁকি দিতে অনেকে ভুয়া জন্ম সনদ তৈরি করে অথবা কাজী ছাড়া রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ে সম্পাদন করছে।
আরও পড়ুনঅপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে কিছুদিনের মধ্যেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র মতের অমিল দেখা দিচ্ছে। এছাড়া স্বামীদের মাদকাসক্তি, জুয়া খেলা, পরকীয়া সম্পর্ক এবং যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এই তালাককে আরও উসকে দিচ্ছে। অপরদিকে শহরে নারীরা শিক্ষিত সচেতন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় তারা নিজেদের জীবন রক্ষার্থে আগে পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
স্বামীদের নির্যাতন ও মাদকাসক্তির কারণে বর্তমানে তালাকের আবেদনের সিংহভাগই আসছে নারীদের পক্ষ থেকে। বগুড়া জেলা কাজী সমিতির একাধিক প্রতিনিধি জানান, আগে মাসে দুই-চারটি তালাকের নোটিশ আসলেও এখন প্রতি সপ্তাহে কাজি অফিসগুলোতে অসংখ্য তালাকের আবেদনের জমা হচ্ছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যেই ঘর ভাঙার এই প্রবণতা সর্বোচ্চ।
গত আড়াই বছরে জেলায় যতগুলো বিয়ে হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি ভেঙে গেছে। এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩২টি করে তালাক নিবন্ধিত হচ্ছে। ভুয়া জন্ম সনদের মাধ্যমে বাল্য বিয়ে বা রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ে, স্বামীদের মাদকাসক্তি, যৌতুক এবং পরকীয়ার কারণে সৃষ্ট পারিবারিক কলহ থেকেই তালাকের হার বাড়ছে। জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য অনুযায়ী গত আড়াই বছরে বগুড়া জেলায় মোট বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে ৬১ হাজার ৪০৬টি।
একই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক হয়েছে ৩২ হাজার ২০৮টি। শতকরা হিসাবে এই আড়াই বছরে গড় তালাকের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুটি বিয়ের বিপরীতে একটিরও বেশি তালাক হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরাঞ্চলের চেয়ে বর্তমানে জেলার গ্রামাঞ্চলেই এই বিচ্ছেদের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে যাদের বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটছে তাদের অধিকাংশের কিশোরী বয়সে বিয়ে হলেও কোনো কাজী বা রেজিস্টার অফিসের কোথাও তালাকের সময় বয়স উল্লেখ করা হয় না। এই কারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা ইউনিসেফের মত দায়িত্বশীল সংস্থার জরিপে বাল্যবিয়ের হার উঠে এলেও কিশোরী তালাকের হার কোথাও উল্লেখ্য নেই।
মন্তব্য করুন









