ফিটনেসবিহীন যানবাহনের মহোৎসব
রাজধানীতে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন শনাক্তে আসছে 'রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন'
শেখ শাহরিয়ার হোসেন : রাজধানীর সড়কে প্রতিদিন চলাচল করছে বিপুলসংখ্যক ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন। এসব যানবাহনের অনেকগুলোর নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই। আবার কাগজপত্র ঠিক থাকলেও কিছু গাড়ির বডি, সিগন্যাল লাইট, গ্লাসসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি সড়কে দুর্ঘটনা ও যানজটের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালালেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না পরিস্থিতি। অভিযানের সময় অনেক যানবাহন জব্দ ও ডাম্পিং করা হলেও বিভিন্ন সড়কে এখনও পুরনো, জরাজীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়।
বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পুরনো বাস, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের চলাচল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব যানবাহনের কোনো কোনোটি থেকে অতিরিক্ত ধোঁয়া বের হয়। আবার অনেক গাড়ির ব্রেক, লাইট, সিগন্যাল ব্যবস্থা ও অন্যান্য যান্ত্রিক অংশত্রুটিপূর্ণ থাকায় সড়কে চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। সম্প্রতি ঢাকায় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি হাসপাতালে ঢুকে পড়ে। এতে এক নারীর মৃত্যুও হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু কাগজপত্রের মেয়াদ যাচাই করলেই যানবাহনের প্রকৃত ফিটনেস নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অনেক সময় কোনো গাড়ির ফিটনেস সনদ বৈধ থাকলেও বাস্তবে সেটির বডি ও যন্ত্রাংশ এমন অবস্থায় থাকে, যা নিরাপদ চলাচলের উপযোগী নয়। তাই কাগজপত্রের পাশাপাশি যানবাহনের বাস্তব অবস্থা ও কারিগরি সক্ষমতাও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর অনেক গাড়ি আবার সড়কে নামার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সীমিত জনবল ও নজরদারির কারণে রাজধানীর সব সড়কে একসঙ্গে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিএ। আরএফআইডি (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন) আর্চওয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ফিটনেস ও অন্যান্য তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ফিটনেসবিহীন যানবাহন দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি যানবাহনের নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, মালিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অভিযান জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জব্দ করা যানবাহন রাখার জন্য পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্টেশন ও জায়গার ব্যবস্থা না থাকলে বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা থেকে যাবে।
আরও পড়ুনসংশ্লিষ্টদের মতে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ডাম্পিং স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সড়কে চলাচলের আগে যানবাহনের প্রকৃত কারিগরি অবস্থা যাচাই এবং ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত চলাচল বন্ধ রাখা গেলে যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবেয়া

বিআরটিএ'র উপ-পরিচালক মোঃ সামিউল মাসুদ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, অনেক ফিটনেসবিহীন যানবাহনের মালিক হালনাগাদ কাগজপত্র না থাকায় অভিযান চলাকালে দাবি করেন, তাদের কাগজপত্র পুলিশের কাছে রয়েছে। তবে যানবাহনের নম্বর যাচাই করে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন আগে ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এমনকি কিছু যানবাহন নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালও অতিক্রম করেছে।
তিনি বলেন, গত এক মাসে শুধু ঢাকায় পুলিশ প্রায় ৫৫০টি এবং বিআরটিএ'র মোবাইল কোর্ট প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি যানবাহন ডাম্পিং করেছে। তবে জনবল সংকটের কারণে সব যানবাহন নিয়মিত নজরদারিতে রাখা কঠিন। ফিটনেসবিহীন যানবাহন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে আরএফআইডি আর্চওয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ১৪টি আরএফআইডি আর্চওয়ে চালু রয়েছে। আরও ১২টি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এসব আর্চওয়ের মাধ্যমে সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের ফিটনেস সংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, বিআরটিএ'র কাগজপত্র ঠিক থাকলেও গাড়ির বডি, সিগন্যাল লাইট, গ্লাসসহ বিভিন্ন অংশ নষ্ট বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের যানবাহন জব্দ করে প্রয়োজনীয় মেরামতের জন্য গ্যারেজে পাঠানো হয়। তবে ইচ্ছা করলেই বেশিসংখ্যক যানবাহন জব্দ করা সম্ভব হয় না। কারণ, জব্দ করা গাড়ি রাখার জন্য ডাম্পিং স্টেশনের সক্ষমতা ও জায়গার সংকট রয়েছে।
মন্তব্য করুন









