গৃহবন্দি শৈশব, বঞ্চিত পরিবার
বগুড়া মহানগরে খেলার মাঠ ও বিনোদন কেন্দ্রের সংকট
হাফিজা বিনা : উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বগুড়া মহানগর দিন দিন ইট-কাঠ-পাথরের খাঁচায় রূপ নিচ্ছে। বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আর যানবাহনের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে খোলা জায়গা ও খেলার মাঠ। ফলে শিশু-কিশোর ও তাদের পরিবারগুলো বঞ্চিত হচ্ছে মানসিক বিকাশ ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ থেকে। শহরের পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রের তীব্র সংকটে গৃহবন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আদর্শ ও সুস্থ শহরের মোট আয়তনের অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকা পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত সবুজ বলয় হিসেবে থাকা উচিত। কিন্তু বগুড়া পৌর সিটি কর্পোরেশনের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বগুড়া মহানগরের ২১টি ওয়ার্ডে প্রায় ৫ লাখ মানুষের বসবাস। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর বিপরীতে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য উন্মুক্ত সরকারি ও সার্বজনীন মাঠের সংখ্যা হাতেগোনা।
এরমধ্যে শহরের ঐতিহ্যবাহী আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ, জিলা স্কুল মাঠ, এডওয়ার্ড পার্ক এবং সম্প্রতি তৈরি করা করতোয়া নদীসংলগ্ন ওয়াকওয়ে ছাড়া শহরের অভ্যন্তরীণ পাড়া-মহল্লায় কোনো মুক্ত স্থান নেই। পার্ক বা ফাঁকা যেসব জায়গা ছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই দোকানপাট ও অস্থায়ী অবকাঠামো দিয়ে দখলে চলে গেছে। সুস্থ বিনোদনের স্থান না থাকায় বগুড়া শহরের বেশিরভাগ শিশু-কিশোর অতিরিক্ত মাত্রায় স্মার্টফোন, কম্পিউটার গেমস ও ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
বিষেশষজ্ঞদের মতে, খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, চশমার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কায়িক শ্রমের অভাবজনিত শারীরিক জটিলতা বাড়ছে। উন্মুক্ত প্রকৃতির অভাব ও সামাজিকীকরণের সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের মাঝে বিষন্নতা ও একাকীত্ব বাড়ছে।
বগুড়া মহানগরের জলেশ্বরীতলার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, আমার দুই ছেলে-মেয়ে। পড়ালেখা করছে শহরের দুটি স্বনামধন্য স্কুলে। স্কুলে গিয়ে টিফিনের ২০ মিনিট খাওয়ার ফলে তারা খেলার সময় পায় না। বাড়ি আসার পর বিকেলে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে কোথাও যে একটু হেঁটে আসব, বা ওরা একটু দৌড়াদৌড়ি করবে পুরো শহরে এমন কোনো পরিবেশ নেই।
এডওয়ার্ড পার্কে যেটুকু পরিবেশ আছে, সেখানেও বিকেলে ভিড় আর বখাটেদের আড্ডা থাকে। আর শহরের মধ্যে যেসব বিনোদন পার্ক ছিল তার অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে এবং আর যেগুলা আছে তাতে সন্তানদের নিয়ে যাবো তার কোন পরিবেশ নেই। বাধ্য হয়ে ছুটির দিনেও বাচ্চাদের ঘরে আটকে রেখে মোবাইল হাতে তুলে দিতে হয়।
আরও পড়ুনবগুড়া সরকারি একটি স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইরফান আহম্মেদ জানায়, স্কুলের পর কোথাও খেলার জায়গা নেই। গ্যারেজের সামনে বা গলির রাস্তায় ক্রিকেট খেলতে গেলে বড়রা বকা দেয়। পার্কগুলোতেও বড়দের ভিড় থাকে। গ্রামের ছেলেমেয়েদের মত মাঠে গিয়ে দৌড়াতে খুব ইচ্ছে করে, কিন্তু সুযোগ কই?
বগুড়ার ডায়াবেটিস হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ আলী আশরাফ বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা না করলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা প্রতিদিন এমন অনেক শিশু পাচ্ছি যাদের মূল সমস্যা স্ক্রিন এডিকশন ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও চোখের সমস্যা, টাইপ টু ডায়াবেটিস, স্থুলকায়া, খিটখিটে মেজাজ, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া ছাড়াও নানা সমস্যা।
শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা উন্মুক্ত স্থানে খেলাধুলা ও দৌড়াদৌড়ি করা জরুরি। উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্রের অভাবে আমরা একটি অসুস্থ মানসিকতার প্রজন্ম তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
এ ব্যাপারে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন বলেন, শিশুদের বিনোদন ও খেলাধুলার জন্য পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে বগুড়ার সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে যেসব খাস জমি আছে তার একটা তালিকা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে হাতে এসেছে। সেগুলো উদ্ধার করে সেসব স্থানে পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানো হবে এবং শিশুদের জন্য খেলাধূলা এবং তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে।
মন্তব্য করুন









