'তোমরা আমার চাকরিডা খাইয়ো না’- শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষক
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে জলাবদ্ধতার জেরে সাতজন শিক্ষককে একযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বদলি করা হয়েছে। এই বদলির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে তাদের সামনে হাতজোড় করে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীন। একপর্যায়ে তিনি শিক্ষার্থীদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে আন্দোলন বন্ধের আকুতি জানান।
শনিবার (২৫ জুলাই) কলেজের সামনে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে গেলে এই দৃশ্যের অবতারণা হয়। সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীন, যার ঘরে একজন প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তাকে বদলি করা হয়েছে বরগুনা সরকারি কলেজে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে তিনি হাতজোড় করে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, 'মা, আমরা সরকারি চাকরি করি, তোমরা আমার চাকরিডা খাইয়ো না। তোমরা এখানে আন্দোলন করলে আমার চাকরিডা চলে যাব।' এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে শিক্ষার্থীদের পায়ে লুটিয়ে পড়েন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি হলেই কলেজে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এর দায় শিক্ষকরা কেন নেবেন? শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তোলেন, 'আমরা তো আর হেলিকপ্টারে করে কলেজে আসব না। জলাবদ্ধতার জন্য যারা প্রকৃত দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শিক্ষকদের কেন এভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে?' তারা এই বদলি আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-২ শাখার উপসচিব মো. আ. কুদ্দুস স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই সাত শিক্ষককে ওএসডি করার তথ্য জানানো হয়। আদেশে বলা হয়, আগামী ২৯ জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হতে হবে।
বদলীকৃত অন্য শিক্ষকরা হলেন— কলেজের উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলম (চৌদ্দগ্রামের চিওড়া সরকারি কলেজে), গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মালেক (কক্সবাজার সরকারি কলেজ), উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কনক বড়ুয়া (নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে), ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উল্লাহ মজুমদার (লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ নূর উল্লাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজ) এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আল-আমিন (সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে)।
আরও পড়ুনজানা গেছে, উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলম পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন না, কারণ তার ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। অধ্যাপক আবদুল মালেক কনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সিনিয়রেরা দায়িত্ব না নেওয়ায় তাকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কনক বড়ুয়া ছিলেন পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এবং মোহাম্মদ মহসীন কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক।
গত ১৮ জুলাই কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী কলেজে গিয়ে জলাবদ্ধতা ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এবং বৃষ্টিতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণে সরকার ও শিক্ষামন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
তবে শিক্ষকদের দাবি, কলেজে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই পরীক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। গত ১৩ জুলাই সকালে বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও কোনো পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল না এবং পরীক্ষা যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেবল বৃষ্টির পানির কারণে শিক্ষকদের এভাবে গণবদলির ঘটনা নজিরবিহীন।
মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, বদলি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং মন্ত্রণালয় যে কাউকে যেকোনো সময় বদলি করতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ জুলাই অতিবৃষ্টির ফলে কলেজ প্রাঙ্গণে জলাবদ্ধতা হয়। তখন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপুর উদ্যোগে ডিঙি নৌকা ও ভ্যানগাড়ি দিয়ে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়। কলেজের শিক্ষকেরাও সেই সময় ভিজে ছাত্রীদের কেন্দ্রে নিতে সহায়তা করেছিলেন।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক






