ভিডিও মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৬ জুন, ২০২৬ ০৪:০০ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় চরম অনিশ্চয়তায় নেতানিয়াহু

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় চরম অনিশ্চয়তায় নেতানিয়াহু, ছবি: সংগৃহীত।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান ও নিরাপত্তা কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বহু বছর ধরে নেতানিয়াহু নিজেকে ওয়াশিংটনে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। মার্কিন রাজনীতিতে তার বিশেষ প্রভাব রয়েছে বলেও ধারণা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার পরও কীভাবে তিনি ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে এতটা উপেক্ষিত হলেন? একই সঙ্গে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইরানকে ইসরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রাজনীতি করা নেতানিয়াহু কীভাবে এমন একটি যুদ্ধবিরতির বাস্তবতার মুখোমুখি হলেন, যেখানে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে তেহরান আগের চেয়ে আরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে?

এদিকে ইসরায়েলের ‘মি. সিকিউরিটি’ হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তিও ক্রমশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। এর মধ্যে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চাপের কারণে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করতে হয়, তাহলে তার নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিচয় আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের ভাষায়, নেতানিয়াহুর সামনে এখন মূলত দুটি পথ খোলা রয়েছে-একদিকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের চাপ মেনে নিয়ে ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থে ছাড় দেওয়া। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে। বৈরুতে হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু ‘কোনো বিবেচনার পরিচয় দেননি’ বলে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছেন, সেটিকে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে বিরোধীরা। আগামী অক্টোবরে সম্ভাব্য নির্বাচনের আগে এই ইস্যু আরও গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুধু বিরোধীরাই নয়, নেতানিয়াহুর নিজ দল লিকুদ এবং ক্ষমতাসীন জোটের কট্টরপন্থী অংশ থেকেও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে তেহরানের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-এমন খবর প্রকাশের পর ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।

আরও পড়ুন

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি মানতে আমরা বাধ্য নই। আমরা এমন কোনো চুক্তির অংশ নই, যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।’ অন্যদিকে লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য অ্যারিয়েল কালনার বলেছেন, ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে থাকবে। যদিও তিনি সরাসরি নতুন হামলার ইঙ্গিত দেননি।
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শিনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান বোঝা কঠিন। তার ভাষায়, লেবাননের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে ইরানকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হলে হিজবুল্লাহকে সমর্থন অব্যাহত রাখার পথও খোলা থাকবে। একই সঙ্গে লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনে হিজবুল্লাহর প্রভাবও আরও সুসংহত হতে পারে। তীব্র সমালোচনার মধ্যেও নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। সাধারণত কোনো কূটনৈতিক বা সামরিক সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে তিনি দ্রুত সামনে আসেন। কিন্তু এবার তার নীরবতাকে অনেকেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। 

নিরাপত্তা বরাবরই নেতানিয়াহুর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তিনি যে আরও আক্রমণাত্মক নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেন, তার ফলাফল নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। সেই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল সম্ভাব্য হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই তা ধ্বংস করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত বাস্তবতা বদলে দেওয়া। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরও হামাস পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং সংগঠনটি এখনো গাজার উল্লেখযোগ্য অংশে প্রভাব ধরে রেখেছে এবং পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। একই সময়ে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও রিজার্ভ বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার মতো কার্যকর কোনো কূটনৈতিক পথও এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির ফলে ইরান পুরোপুরি দুর্বল হয়নি; বরং দেশটির কট্টরপন্থী শক্তিগুলো আরও প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। ফলে তেহরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তার মতে, তেহরান ইস্যুতে আরও বাস্তববাদী ও সংযত কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি লিখেছেন, এখন ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকেই ওয়াশিংটনে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভণ্ডুলের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। 

একসময় বারাক ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধের সময় নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেস ও জনমতের সমর্থন কাজে লাগিয়ে হোয়াইট হাউসকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ তার হাতে আর নেই বললেই চলে। ফলে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী বাস্তবতায় নেতানিয়াহু এমন এক রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংকটে পড়েছেন, যেখানে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই আগামী নির্বাচনের আগে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র : বিবিসি। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বকাপে কোন দলের সমর্থক, জানালেন প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ ও গণতন্ত্র কখনো একসঙ্গে যায়নি : মির্জা ফখরুল

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় চরম অনিশ্চয়তায় নেতানিয়াহু

প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনাকে রুখে দিতে চায় আলজেরিয়া

কাবা শরিফে পরানো হলো স্বর্ণখচিত নতুন গিলাফ

বাংলাদেশের তৈরি জার্সি পরে স্পেনকে রুখে দিয়েছে কেপ ভার্দে