শিশু ও কিশোর অধিকার আইন প্রেক্ষিত কিছু কথা
দেশে শিশু ও কিশোর অপরাধ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দেশের জন্য খুবই উদ্বিগ্নের বিষয়। দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম কলম ধরার পরিবর্তে হাতে অস্ত্র ধরে এতে জাতি হিসেবে আমরা অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গের বয়সজনিত অবসর গ্রহণ পরবর্তী আজকের শিশু ও কিশোরেরা আগামীতে দেশের হাল ধরবেন এবং দেশ পরিচালনা করবেন এটাই সত্য কিন্তু অত্যন্ত উদ্বিগ্নের বিষয় যে, এই শিশু কিশোরেরা হত্যা, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, নেশা, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ প্রভূতি অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশের শিশু আইন ১৯৭৪ মোতাবেক ধর্ম, বর্ণ শ্রেণী নির্বিশেষে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত সকল জনগোষ্ঠিকে শিশু বলা যায়। জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে বয়সের সকল ব্যক্তি শিশু হিসেবে বিবেচিত হবে। আইনের ভাষায় কিশোর বয়সের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়নি। তবে বয়োসন্ধিকাল হতে ১৮ বছরের নিচে সকলকে কিশোর হিসেবে বিবেচনা করার প্রাকটিস রয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদে প্রথম অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শিশুরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিশুর সকল অধিকার পাবে। দেশে শিশু অধিকার ও চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে প্রায় ৩২টি আইন রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান অনুযায়ী সকল শিশুর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সুরক্ষা সহ সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যার প্রতিপালন রয়েছে গার্ডিয়ান এ্যান্ড এয়ার্ডস এ্যাক্ট ১৮৯০, শিশু আইন ১৯৭৪, শিশু বিধিমালা ১৯৭৬ সহ অন্যান্য আইনে। আমরা জানি শিশুর জন্মদাতা হিসেবে প্রাথমিকভাবে বাবা মা অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখলেও আইন অনুযায়ী প্রকৃত অভিভাবক হচ্ছে রাষ্ট্র। দেশের আইনে শিশু সুরক্ষার কথাও উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে প্রান্তিক অবহেলিত নির্যাতনের শিকার, অপরাধে জড়িয়ে ফেলা, শিশুদের সুরক্ষা ও পরিচর্যা করা রাষ্ট্রের একটি সামাজিক ও আইনগত দায়িত্ব। এজন্যই সরকার শিশুদের জন্য এতিমখানা, শিশু পরিবার, সেইফ হোম, ভবঘুরে কেন্দ্র, শিশু ও কিশোর সংশোধনাগার প্রভূতি সেবা কার্যক্রম চালু করেছে। দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যগণ শিশুদের যেকোন অবহেলা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করার সক্ষমতা রাখেন। দেশের সংবিধানের শিশুর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সুরক্ষা সহ অন্যান্য অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে ধারা ২৭ ও ৩১ এ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, ধারা ২৮ ও ২৯ এ বৈষম্যহীনতা, ধারা ৩২-এ জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার সংরক্ষণ, ধারা ৩৩-এ গ্রেফতার ও আটক সংক্রান্ত ধারা ৩৬-এ চলাফেরার স্বাধীনতা, ধারা ৩৯-এ চিন্তা ও বাক স্বাধীনতার অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। দেশের সংবিধানে এরুপ অধিকার ও স্বাধীনত স্বীকৃত হবার পরও প্রতিনিয়ত শিশুর জীবন ও বেঁচে থাকার অধিকার ও স্বাধীনতা লংঘিত হচ্ছে এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ে কারাগারে বন্দি অবস্থায় জীবন কাটছে। বাংলাদেশের শিশুদের সুস্থ দেহ ও মন নিয়ে বেড়ে ওঠার অন্তরায় ও উদ্বেগের অন্যতম কারণ নিরাপত্তা বা নিরাপদ পরিবেশের অভাব। মনোবিজ্ঞানীদের মতে যেকোন সহিংস আচরণই শিশুর জীবনে সূদুর প্রসারী প্রভাব ফেলে। অবহেলা, শোষণ, নিপীড়ন বা স্বাভাবিক পরিবেশের অভাব একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে এবং যা তাকে পরবর্তী জীবনে একজন নির্যাতনকারীর ভূমিকা নিতে সহায়তা করে। শিশু কিশোররা অপরাধের সাথে কেন জড়িয়ে পড়ছে তা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর আবাসস্থল তৈরি করা প্রয়োজন। দেশে বিরাজমান যৌথ ফ্যামিলি ভেঙ্গে পড়া এর অন্যতম কারণ। যৌথ ফ্যামিলিতে শিশুরা অধিক আপন লোকজনের মধ্যে বেড়ে ওঠে। এতে শিশুদের ভাল সময় কাটে। মানবতা শিখে, সকলের শাসন, আদর ও স্নেহের মধ্যে শিশুর বিকাশ ঘটে। যৌথ ফ্যামিলি পর্যায়ক্রমে ভেঙ্গে পড়ায় শিশুরা বাবা-মা বা একটি ফ্যামিলির মধ্যে বন্দি অবস্থায় বা একটি নির্দিষ্ট চক্রের মধ্যে বড় হতে থাকে। এতে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বিঘ্নতার সৃষ্টি হয় এবং শিশুরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, যা বাবা মা ও অনেক সময় বুঝতে পারেনা। অপরদিকে শিশুরা বাসা বন্দি হওয়ায় অনলাইন গেইম, মোবাইল এবং হোম গেইমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। এতেও তাদের স্বাভাবিক জ্ঞান বৃদ্ধি লোপ পায় এবং সমাজের সাথে খাপ খেয়ে চলতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। উন্মুক্ত খেলার মাঠ হ্রাস পাওয়ায় শিশুদের মাঠ ভিত্তিক খেলা এক রকম বন্ধ হয়ে গেছে। এতেও শারীরিক ব্যায়াম বা খেলার আনন্দ এবং অন্যান্য শিশুদের সাথে মেশার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনলাইন বা মিডিয়ার সাথে আসক্ত হয়ে পড়ায় বিদেশী কৃষ্টি কালচারের সাথে আসক্ত হয়ে পড়ায় ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়াও অন্যতম কারণ। ভবিষ্যতে এভাবে চলতে থাকলে আমাদের আগামীতে দেশ মেধা শূন্য হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই দেশকে বাঁচানোর স্বার্থে আমাদের শিশু ও কিশোরদের প্রতি সচেতন হয়ে তাদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সকল চাহিদা পূরণে সরকার ও অভিভাবকগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক :
নজিবর রহমান জিয়া
কলামিষ্ট ও গবেষক
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1781347124.jpg)

_medium_1781171521.jpg)


