ভিডিও রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৭ জুন, ২০২৬, ০১:৪৮ দুপুর

আমরা কি পারিবারিক বন্ডিং থেকে দূরে সরে যাচ্ছি 

একটি ঘটনা কয়েকদিন যাবৎ দেশের পেপার পত্রিকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, আর তাহলো ঢাকা মিরপুরের একটি বাসার নোংরা আবর্জনাযুক্ত ঘর থেকে নুরজাহান বেগম নামে ৭৫ বছর বয়স্ক একজন মহিলার পচন ধরা একটি লাশ পুলিশ উদ্ধার করায়। পত্রিকায় দুই রকম খবর এসেছে, বিধবা নুরজাহানের তিন ছেলে ও এক মেয়ে আছে, অন্য খবরে জানা গেছে মহিলার দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। নুরজাহান বেগমের তিন পুত্র ও এক কন্যা সবাই উচ্চ শিক্ষিত। এক ছেলে উচ্চপদস্ত সরকারি কর্মকর্তা অর্থাৎ উপসচিব পদমর্যাদার, একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন কানাডা প্রবাসী ও একমাত্র কন্যা সেও একজন স্কুলের শিক্ষিকা। হতভাগ্য বিধবার সন্তানগুলো সবাই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, অথচ হতভাগ্য ওই মহিলা এক বাড়িতে একাকি বাস করেন এটা বড়ই আফসোসের বিষয়। একবার এক প্রবীণ দিবসে এক মা দুঃখ করে বলেছিলেন একটি মায়ের সাত আটটা সন্তান হলেও মা তার সন্তানদের ঠিকঠাকভাবে লালন-পালন করে কোন অসুবিধা হয় না, অথচ সেই সন্তানগুলো বড় হলে  কোনো সন্তানের বাড়িতে ওই মায়ের থাকা-খাওয়ার জায়গা হয় না, এটা যদিও সব ক্ষেত্রে সঠিক নহে, তথাপিয় অধিকাংশ পরিবারেই এখন এটা দেখা যাচ্ছে। হতভাগ্য নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর তার লাশে পচন ধরে যখন  আশে পাশে গন্ধ বের হয়েছে তখন প্রতিবেশিরা ৯৯৯ এ কল করার পর পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের ব্যবস্থা করেছে, বিষয়টি তদন্তাধীন, আর তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে কথা বলা সমীচীন নয়। তবে একথাতো ঠিক হতভাগ্য বিধবা ওই বাড়িতে একাকি বসবাস করতো। একজন ৭৫ বছর বষস্ক মহিলা এক বাড়িতে একাকি বসবাস করার কথা ভাবাও যায় না, কারণ ৭০ বছর পর একজন মানুষের দেহে নানা রোগ বাসা বাঁধে, তাকে শুধু খাওয়ালে পড়ালে চলবে না, তার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্যে প্রয়োজন তাকে সঙ্গ দেওয়া। একজন কঠিন রোগের রোগী হলেও ডাক্তার যদি বলে আপনার কিচ্ছু হয়নি, আপনি সেরে উঠবেন, তখন সে রোগী বাঁচার স্বপ্ন দেখে, একজন ডাক্তারের চেম্বারে একটি সাইনবোর্ড দেখেছিলাম, সেখানে লেখা আছে, প্যাসেন্ট ডিজায়ার ডক্টরস্ কনফিডেন্ট। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম এটা কেন লিখেছেন তিনি উপরের উত্তরটাই দিলেন। আমরা এখন কোন পথে হাঁটছি। পরিবারের অসুস্থ সদস্যকে কি আমরা একটু সময় দিতে পারি না ? আমরা কি প্রবীণদের প্রতি একটু সহানুভূতি দেখাতে পারি না। আমরা নিজেরা নিজদেরকে নিয়ে এতো বেশি ভাবি যে আশে-পাশেতো দূরের কথা নিজের পরিবারের অসুস্থ সদস্যদেরকেও খোঁজ-খবর নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করি না, আমরা এতো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি চিন্তাই করা যায় না।  বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষতার যুগে আমরা একা হয়ে পড়ছি কিনা আজ তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমার এক বন্ধু একবার অষ্ট্রেলিয়ায় গিয়ে একদিন বৃদ্ধাশ্রমে গিয়েছিলেন। তাঁর মুখে গল্প শোনা, বৃদ্ধাশ্রমে এক বৃদ্ধ প্রায় উলঙ্গ হয়ে নাচানাচি করছে, কারণ পাঁচ বছর পর তার এক সন্তান তাকে দেখতে আসছে এই আনন্দে। অষ্ট্রেলিয়ায় এই গল্প মানায় কিন্তু আমাদের না। ছাত্রাবস্থায় যাযাবরের দৃষ্টিপাত পড়েছিলাম, সেখানে লেখক বলেছেন, আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দেখিয়াছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাতে আছে গতির আনন্দ, নেই যতির আয়েস। আমরা কি একবারও ভেবে দেখবো না, মাত্র কয়েক বছর পরে আমরাওতো প্রবীণদের খাতায় নাম লেখাবো, তখন আমাদের কে দেখবে, আমরাও কি নুরজাহান বেগমের মতো একাকি একঘরে মরে পড়ে থাকবো ? আমাদের পারিবারিক বন্ধন কি একবারেই শেষ হয়ে গেল ? অথচ কিছুদিন পূর্বেও বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সুখী দেশের তালিকায় এক নাম্বারে ছিলো। পারিবারিক বন্ধনের কারণে আমরা সুখী দেশের তালিকায় এক নাম্বারে ছিলাম। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক বন্ধন ভেঙ্গে যাওয়ায় আমরা একাকি হয়ে পড়ছি, সম্ভবত এক নাম্বার স্থানটা আর আমরা ধরে রাখতে পারবো না। সমাজের আয়নায় আমরাতো এখন অসুস্থ প্রতিযোগিতার ছবি দেখছি, অথচ আমরা একটু চিন্তা করি না, আমার নিজের ভাগ্যতো নুরজাহানের মতো হতে পারে। একটা গল্প মনে পড়ে গেল, এক ছেলে তার বাবার গলায় গামছা বেঁধে হিঁড়হিঁড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর বাবাকে বলছে, তোকে আজ নদীতে ডুবাইয়া মারবো, তুই শুধু বাড়িতে বসে থেকে খাস আর প্যাচাল পাড়িস, তোকে আজ শেষ করে দিবো। কিছুদূর টেনে নিয়ে যাওয়ার পর বাবা ছেলেকে বলছে, বাবা তুই আর আমাকে টেনে নিয়ে যাস না, তুই আর এক পা টেনে নিয়ে গেলে তোর কবিরা গুনাহ হবে। তখন ছেলে বলছে, কিসের কবিরা গুনাহ। বাবা তখন উত্তর দিয়ে বলছে আমি আমার জীবদ্দশায় তোর দাদাকে এই পর্যন্তই টেনে এনেছিলাম, এটুকু আমার পাওনা আছে, এর পরে আমাকে তুই টেনে নিয়ে গেলে সত্যিই তোর কবিরা গুনাহ হবে। যেমন কর্ম তেমন ফল। 


পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩। এই আইনের ৫ ধারায় বলা আছে, যদি কোন সন্তান পিতা- মাতার ভরণ-পোষণ না করে, তাহলে এটি আপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি সর্বোচ্চ এক লক্ষ টাকা জরিমানা, জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ডের বিধান আছে। শুধু টাকা দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়, চিকিৎসা, যত্ন, খোঁজ-খবর, দেখা সাক্ষাৎ এবং মানসিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ, সম্ভবত নুরজাহানের বেলায় কিছুই হয়নি। তার সন্তানেরা এই অপরাধের দায় থেকে বাঁচতে পারে না। তদন্তান্তে তাদের আইনামূলে আনায়ন জরুরি। 
জন্মিলে মরতে হবে এর কোন ব্যত্যয় নাই, তবে নুরজাহানের মৃত্যু সুখের হয় নাই। শরৎচন্দ্রের দেবদাসের কথা মনে পড়ে গেল, এখন এতদিনে পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না, শুধু দেবদাসের জন্যে বড় কষ্ট হয়। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি শ্রেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে- যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময়ে যেন কাহারও একফোঁটা চোখের জল দেখিয়া মরিতে পারে। নুরজাহানের সব থাকা সত্ত্বেও তার ভাগ্যে এটা জোটেনি।

লেখক :

আরও পড়ুন

এড. মোজাম্মেল হক

উপদেষ্টা, বগুড়া জেলা বিএনপি

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমরা কি পারিবারিক বন্ডিং থেকে দূরে সরে যাচ্ছি 

প্রস্তুতি ম্যাচে কেইনের গোল জয় ইংল্যান্ডের

রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা : উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকার আশা আইনমন্ত্রীর

ইসরায়েলের কমান্ড হেডকোয়ার্টারে হামলা

দেশজুড়ে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস

গাজায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৬