ভিডিও রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকাশ : ৩১ মে, ২০২৬, ০৪:৪৩ দুপুর

কোরবানির শিক্ষা, তাৎপর্য ও আমাদের করণীয়

কোরবানির শিক্ষা, তাৎপর্য ও আমাদের করণীয়,ছবি: সংগৃহীত।

আরবী ‘কুরবান’ শব্দটি ফারসী বা ঊর্দূতে ‘কোরবানি’ রূপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ ‘নৈকট্য’। পারিভাষিক অর্থে  ‘কোরবানি ওই মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। প্রচলিত অর্থে, ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ তরীকায় যে পশু যবেহ করা হয়, তাকে ‘কোরবানি বলা হয়’। সকালে রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কোরবানি করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে।  যদিও কোরবানি সারাদিন ও পরের দু’দিন করা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আর কোরবানির পশু সমূহকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে’ (সূরাঃ হজ্জ-৩৬)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমরা কোরবানির বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ গবাদিপশু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। অনন্তর তোমাদের উপাস্য মাত্র একজন। অতএব তাঁর নিকটে তোমরা আত্মসমর্পণ কর এবং আপনি বিনয়ীদের সুসংবাদ প্রদান করুন’ (সূরাঃ হজ্জ- ৩৪)। 

আল্লাহ আরও বলেন,  ‘আর আমরা তার (অর্থাৎ ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবেহ করার জন্য দিলাম একটি মহান কোরবানি’। ‘এবং আমরা এটিকে (অর্থাৎ কোরবানির এ প্রথাটিকে) পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’ (সূরাঃ ছাফফাত- ১০৭-১০৮) আল্লাহ বলেন,  ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর এবং কোরবানি কর’ (সূরাঃ কাওছার-২)। কাফির-মুশরিকরা তাদের দেব-দেবী ও বিভিন্ন কবর ও বেদীতে পূজা দেয় ও মূর্তির উদ্দেশ্যে কোরবানী করে থাকে। তার প্রতিবাদ স্বরূপ মুসলমানদেরকে আল্লাহর জন্য ‘ছালাত আদায়ের ও তাঁর উদ্দেশ্যে কোরবানি করার’ হুকুম দেওয়া হয়েছে। ঈদুল আযহার দিন প্রথমে আল্লাহর জন্য ঈদের ছালাত আদায় করতে হয়, অতঃপর তাঁর নামে কোরবানি করতে হয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী  না হয়’। ইবনু মাজাহ, আলবানী-ছহীহ ইবনু মাজাহ হা/২৫৩২;।

এটি ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’, যা ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে মদীনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং ছাহাবীগণও  নিয়মিতভাবে কোরবানি করেছেন। অতঃপর অবিরত ধারায় মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে। এটি কিতাব ও সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারা সুপ্রমাণিত। মির‘আত ৫/৭১, ৭৩ পৃ. কোরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহভীতি অর্জন করা। আল্লাহ বলেন,  ‘কোরবানীর পশুর গোশত বা রক্ত আল্লাহর নিকটে পৌঁছে না। বরং তাঁর নিকটে পৌঁছে কেবলমাত্র তোমাদের ‘তাক্বওয়া’ বা আল্লাহভীতি’ (সূরাঃ হজ্জ- ৩৭)। কোরবানি করা সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ। শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি মাজহাব অনুযায়ী, কোরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া সুন্নাত)। 

যা ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে মদীনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং ছাহাবীগণও নিয়মিতভাবে কোরবানি করেছেন (মির‘আত ৫/৭১, ৭৩ পৃ.)। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। তবে এটি ওয়াজিব নয় যে, যেকোন মূল্যে প্রত্যেককে কোরবানি করতেই হবে। লোকেরা যাতে এটাকে ওয়াজিব মনে না করে, সেজন্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হযরত আবুবকর ছিদ্দীক, ওমর ফারুক, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস, বেলাল, আবু মাসঊদ আনছারী প্রমুখ (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ কখনো কখনো কোরবানি করতেন না। তাফসীরে ইবনে কাছীর ৩/২৩৪)  কোরবানীর তাৎপর্য হলো, আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করার জাযবা সৃষ্টি করা,  ইবরাহীম (আঃ) এর পুত্র কোরবানির ন্যায় ত্যাগ-পূত আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করা। উত্তম খানা-পিনার মাধ্যমে ঈমানদারগণের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করা ও তাঁর বড়ত্ব প্রকাশ করা। বর্তমান সমাজে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। কেউ কেউ এটিকে লোক দেখানো বা প্রতিযোগিতার বিষয় বানিয়ে ফেলে।

খামারে বড় হওয়া গরুর নাম ‘মেসি’, ‘রোনালদো’, ‘ট্রাম্প’ বা ‘মোদি’ রাখা এবং তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাতামাতি করা একটি সাধারণ ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি পবিত্র ইবাদতের পশুকে নিয়ে এভাবে ঠাট্টা-মশকরা ও সস্তা বিনোদন ইসলাম সমর্থন করে না। তাছাড়া ইসলামে অহংকার, বেহুদা প্রচারণা ও অপচয় নিষিদ্ধ। তাই আমাদের উচিত কোরবানির মাধ্যমে বিনয়, তাকওয়া ও মানবতার শিক্ষা গ্রহণ করা। 

আরও পড়ুন

পরিশেষে বলা যায়, কোরবানি আমাদের ত্যাগ, ধৈর্য, আনুগত্য ও মানবতার শিক্ষা দেয়। এই শিক্ষা যদি আমরা বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারি, তবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই কোরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে আন্তরিকতার সঙ্গে এই মহান ইবাদত পালন করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। 

লেখক :

সোহরাব হোসেন সোহাগ

সহকারী অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কোরবানির শিক্ষা, তাৎপর্য ও আমাদের করণীয়

অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম, নারী-শিশুসহ আটক ১০

ভাঙ্গায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস খাদে, আহত ২৫

মুন্সীগঞ্জে ১৪ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক ১

চাঁদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল এসএসসি পরীক্ষার্থীর

ঈদুল আজহা : ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত মানবতার দীপশিখা