পশু কুরবানির সাথে নিজের অহংকার কুরবানি করি
ঈদুল আজহা আসে প্রতি বছর। আসে ত্যাগের মহিমা নিয়ে, আসে আনন্দ ও উৎসবের আমেজ নিয়ে। কিন্তু এই উৎসবের যে গভীর আধ্যাত্মিক ও মানবিক বার্তা, তা কি আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে? প্রশ্নটি কঠিন, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কুরবানির উৎস হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় আত্মত্যাগের ঘটনায়। নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করার সেই দৃষ্টান্ত কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়-এটি একটি দার্শনিক বিবৃতি: মানুষ তার আসক্তি, অহংকার ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে। পারা উচিত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন-"আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর মাংস এবং রক্ত বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা হজ: ৩৭)। তাহলে আমরা কি সেই তাকওয়ার দিকে যাচ্ছি, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই আটকে থাকছি?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সমাজজীবনে এই মুহূর্তে মানবিকতার বড় সংকট চলছে। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকতায় নেমে এসেছে, সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষ ও গুজবের প্লাবন চলছে। ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গর্ব বাড়ছে, কিন্তু ধর্মের নৈতিক শিক্ষার চর্চা কমছে। মানুষ বড় কুরবানি দিচ্ছে, ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে দিচ্ছে, কিন্তু পাশের বাড়ির অভুক্ত শিশুটির খবর নিচ্ছে না। এই দ্বিচারিতা সমাজকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। ধর্মকে যখন কেবল পরিচয়ের হাতিয়ার বানানো হয়, জীবন পরিবর্তনের পথ হিসেবে নয়-তখন আনুষ্ঠানিকতা বাড়ে, কিন্তু মানুষ বদলায় না।
কুরবানির আসল শিক্ষা এখানেই প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি কুরবানি হওয়া উচিত নিজের অহংকার। সামাজিক মাধ্যম খুললেই দেখা যায়, ভিন্নমত পোষণ করলেই ব্যক্তি আμমণ, গালাগালি ও চরিত্রহনন শুরু হয়। রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি-কোনো বিষয়েই মতের ভিন্নতা সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের কমে যাচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে দ্বিমত পোষণ করা মানেই শত্রুতা নয়, ভিন্নপথে চলা মানেই বিশ্বাসঘাতকতা নয়। অথচ নবীজি (সা.) সারাজীবন শিখিয়েছেন বিনয়, ধৈর্য ও সহনশীলতা। কথায় নয়, তিনি তা দেখিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে।
নবুয়ত লাভের আগে, যৌবনেই মুহাম্মদ (সা.) উপলব্ধি করেছিলেন-সমাজ বদলাতে হলে আগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সেই চেতনা থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন 'হিলফুল ফুযুল'-এ। মক্কার কিছু বিবেকবান তরুণ মিলে গড়ে তুলেছিলেন এই সংঘ-যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অসহায় মানুষের পাশে থাকা। সেই সময় এক ইয়েমেনি বণিক মক্কায় এসে পণ্য বিμি করেছিলেন স্থানীয় এক প্রভাবশালীর কাছে, কিন্তু পাওনা মূল্য পাননি। অভিযোগ জানাতে গিয়ে উল্টো অপমানিত হন। হিলফুল ফুযুলের সদস্যরা সেই খবর পেয়ে একত্রিত হলেন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে বণিকের ন্যায্য পাওনা আদায় করে দিলেন। নবুয়তের বহু পরেও নবীজি (সা.) এই সংঘের স্মৃতি গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতেন। তিনি বলতেন, সেই চুক্তির বিনিময়ে যদি লাল উট-ও দেওয়া হতো, তবু তা ছেড়ে দিতাম না। ইসলামের নবী হওয়ার আগে তিনি হয়েছিলেন মানুষের বন্ধু-এটিই তাঁর চরিত্রের মূল ভিত্তি।
সেই একই মানবিকতার আলো দেখা যায় বহু পরিচিত একটি ঘটনায়। মদিনার পথে এক বৃদ্ধা প্রতিদিন নবীজির চলার রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন-ইসলামের প্রতি তাঁর ক্ষোভ ও বিরোধিতার প্রকাশ ছিল এটি। নবীজি (সা.) প্রতিদিন সেই কাঁটা সরিয়ে চলে যেতেন, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো প্রতিশোধের চিন্তা নেই। একদিন হঠাৎ পথে কাঁটা নেই। নবীজি থামলেন। উদ্বিগ্ন হলেন। খোঁজ নিয়ে জানলেন, বৃদ্ধা অসুস্থ, শয্যাশায়ী। তিনি সোজা চলে গেলেন তাঁর ঘরে। বসলেন পাশে। খোঁজখবর নিলেন। সেবার কথা জিজ্ঞেস করলেন। বৃদ্ধা বিস্মিত-যাঁকে আমি প্রতিদিন কষ্ট দিয়েছি, তিনিই আজ আমার শিয়রে বসে আছেন? এই দৃশ্য বৃদ্ধার ভেতরটা বদলে দিয়েছিল। প্রতিশোধ নয়, ঘৃণা নয়-কেবল নিঃশর্ত মানবিকতা। এটাই ছিল নবীজির (সা.) সবচেয়ে বড় দাওয়াত।
হিংসা, লোভ ও বিদ্বেষও কম বিপজ্জনক নয়। ব্যক্তিজীবনে এই তিনটি ব্যাধি পরিবার ভাঙে, বন্ধুত্ব নষ্ট করে, মানুষকে একা করে দেয়। প্রতিবেশীর নতুন গাড়ি দেখে মনে যে জ্বালা জ্বলে, সহকর্মীর পদোন্নতিতে যে কষ্ট লাগে-এগুলো ছোট মনে হলেও আত্মার ভেতরে ধীরে ধীরে ঘুণ ধরায়। সমাজজীবনে এই ব্যাধিগুলো দুর্বলদের ওপর অত্যাচারকে বৈধতা দেয়, শক্তিশালীর পক্ষে নীরব থাকতে শেখায়। রাষ্ট্রীয় জীবনে লোভ ও ক্ষমতার আসক্তি দুর্নীতির জন্ম দেয়, জনগণের সম্পদ লুট হয়। কুরবানির মৌসুমে আমরা যদি সত্যিই এই অভ্যন্তরীণ শত্রুগুলোকে জবাই করতে পারতাম, তাহলে বাংলাদেশ ভিন্নরকম হতো।
প্রতিবছর কুরবানির মাংস বিতরণ হয়-এটি অবশ্যই একটি ভালো রীতি। কিন্তু দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই কেবল বার্ষিক মাংস বিতরণে হয় না। প্রতিবেশীর সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, কর্মচারীকে ন্যায্য মজুরি দেওয়া, গৃহকর্মীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা-এই ছোট ছোট কাজগুলোর মধ্যেই কুরবানির প্রকৃত মর্ম লুকিয়ে আছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, যার প্রতিবেশী ক্ষুধায় থাকে, সে মুমিন নয়। এই হাদিস আজও আমাদের সামনে একটি কঠিন আয়না। শুধু ঈদের দিন মাংস দিয়ে দায় সারলে হবে না-সারা বছর মানুষের পাশে থাকার মানসিকতাই হলো আসল ইবাদত। যাকাত, সদকা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার যে বিধান ইসলাম দিয়েছে, তার উদ্দেশ্য কেবল ধনী-গরিবের মধ্যে সেতু তৈরি নয়-বরং সমাজে এমন একটি পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি গড়া, যেখানে কেউ একা পড়ে থাকে না।
পারিবারিক জীবনেও কুরবানির শিক্ষার অভাব স্পষ্ট। বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বহীনতার খবর পত্রিকায় আসছে। সম্পদের বিরোধে ভাইবোনের মধ্যে মামলা-হামলা বাড়ছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ধৈর্য ও সহনশীলতার জায়গায় ঢুকে পড়ছে অহংকার আর আত্মকেন্দ্রিকতা। সন্তানকে দামি স্কুলে পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু তাকে সময় দেওয়া হচ্ছে না। সংসারে অর্থের প্রাচুর্য বাড়ছে, কিন্তু ভালোবাসা ও বিশ্বাসের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। ইসলামে পিতামাতার সেবাকে বলা হয়েছে জান্নাতের দরজা-সেই দরজা আমরা নিজেরাই বন্ধ করে দিচ্ছি কিনা, ভেবে দেখা দরকার।
আরও পড়ুনবাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও কুরবানির শিক্ষার প্রয়োজন অপরিসীম। ক্ষমতাকে সেবার সুযোগ না ভেবে সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার যে প্রবণতা বিরাজ করছে, তা এই সমাজের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। নেতৃত্বের অর্থ হলো নিজেকে উৎসর্গ করা-ব্যক্তিস্বার্থকে কুরবানি দেওয়া। ইসলামের ইতিহাসে হজরত উমর (রা.) রাতের আঁধারে নিজে ঘুরে বেড়াতেন সাধারণ মানুষের অবস্থা জানতে, পিঠে বস্তা বহন করেছেন অসহায়ের ঘরে পৌঁছে দিতে। সেটিই ছিল প্রকৃত নেতৃত্ব-ক্যামেরার সামনে নয়, নিভৃতে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেই চেতনা ফিরিয়ে আনা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার। ধর্মের বাহ্যিক আচার পালন করা এবং ধর্মের মানবিক শিক্ষা অনুসরণ করা-এ দুটি আলাদা বিষয়। পশু কুরবানি দেওয়া একটি ধর্মীয় বিধান, তা পালন করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু সেটুকু করলেই কুরবানির পূর্ণ দায়িত্ব শেষ হয় না। ভেতর থেকে মানুষ না বদলালে, সমাজ না বদলালে-শুধু পশু জবাই একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। নবীজি (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।" চরিত্র গড়ে ওঠে ছোট ছোট সিদ্ধান্তে-রাগের মুহূর্তে চুপ থাকায়, অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করায়, দুর্বলের পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানোয়।
এই ঈদুল আজহায় তাই আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন রেখে যেতে চাই: এ বছর আমি কোন অহংকারকে, কোন হিংসাকে, কোন স্বার্থপরতাকে কুরবানি দিতে পারব? পশুর রক্তের পাশাপাশি যদি এই প্রশ্নটি আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি এবং সদ্ভাবে উত্তর খুঁজি-তাহলেই কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা জীবনে কাজে আসবে। হিলফুল ফুযুলের সেই তরুণ মুহাম্মদ (সা.) যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, বৃদ্ধার শিয়রে বসে যেভাবে ঘৃণার জবাব দিয়েছিলেন ভালোবাসা দিয়ে-সেই আদর্শকে যদি আমরা আজকের বাংলাদেশে বুকে ধারণ করতে পারি, তাহলেই একটি মানবিক, সহনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন কেবল কল্পনায় নয়, বাস্তবে রূপ নিতে পারবে।
লেখক:
জাহাঙ্গীর আলম
রাজস্ব, সামাজিক ও পরিবেশ বিশ্লেষক
নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








