পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া উত্থান: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, না নতুন চাপ?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দীর্ঘ ১৫ বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়–এর নেতৃত্বে শাসনের পর পশ্চিমবঙ্গ–এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস–এর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার গঠনের দিকে এগিয়ে আছে—এমন প্রবণতা সামনে এসেছে।
এই পরিবর্তন শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আলোচনার নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করছেন, তাৎক্ষণিক নাটকীয় পরিবর্তনের চেয়ে নীতির ধারাবাহিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ মনে করেন, এই ফলাফল পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। তার মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় নীতিতে বড় কোনো হঠাৎ পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম, ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও স্থিতিশীলতা বজায় থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, দিল্লির সঙ্গে ঢাকার বিদ্যমান যোগাযোগ কাঠামো নতুন পরিস্থিতিতেও কার্যকর থাকবে।
এদিকে, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে নীতিনির্ধারণে সমন্বয় বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা নদী–র পানিবণ্টন চুক্তির মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুতে নতুন করে অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। অতীতে এই চুক্তি আটকে যাওয়ার পেছনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তি বড় কারণ ছিল।
২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং–এর ঢাকা সফরের সময়ও এই আপত্তির কারণে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি—যা বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, রাজনৈতিক সমন্বয় বাড়লেও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হবে। আস্থা গড়ে তোলা ছাড়া বড় অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আরও পড়ুননির্বাচনী রাজনীতিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ, বিশেষ করে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু, প্রায়ই উঠে আসে। এ বিষয়ে অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, উসকানিমূলক বক্তব্য সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ‘পুশব্যাক’ ইস্যু অতীতে যেমন জটিলতা তৈরি করেছে, ভবিষ্যতেও তেমন ঝুঁকি থেকে যায়।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কলকাতা–র স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও খুচরা খাতের বড় অংশ বাংলাদেশি গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দুই দেশের বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।
সাবেক কূটনীতিক মাশফি বিনতে শামস মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতার অংশ। ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়–সহ পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে দলটির বিস্তার সেই প্রবণতাকে আরও জোরদার করেছে।
সবশেষে বিশ্লেষকদের অভিমত—বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মূলত নির্ধারিত হয় ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে, কোনো একক রাজ্য সরকারের মাধ্যমে নয়। তাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপরই নির্ভর করবে।
মন্তব্য করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক








