ভিডিও শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ০১ মে, ২০২৬, ০৫:৪২ বিকাল

হাড়ভাঙা খাটুনি আর ফিকে হওয়া শৈশব

মে দিবস তাদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের লাল তারিখ

হাড়ভাঙা খাটুনি আর ফিকে হওয়া শৈশব মে দিবস তাদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের লাল তারিখ

স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়া শহরের নামাজগড় মোড়ে ধুলোবালির মধ্যে রিকশার প্যাডেলে পা রেখে ঘাম মুছছিল বারো বছরের নাহিদ। মে দিবসের দুপুরে যখন শহরের বড় বড় মিল-কারখানা বন্ধ, তখন নাহিদের চাকা থামার জো নেই। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা মাঠপর্যায়ে ডিউটি শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি মনোয়ার হোসেন। আজ ১ মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। সারাবিশ্বে যখন শ্রমিকের অধিকার আর ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টার জয়গান গাওয়া হচ্ছে, তখন মনোয়ার বা আতিকদের মতো হাজারো মানুষের কাছে এই দিনটি কেবলই ক্যালেন্ডারের একটি লাল তারিখ।

ঘাম ঝরানো জীবন, তবুও মেলেনি ‘শ্রমিক’ স্বীকৃতি : পঞ্চাশোর্ধ্ব মনোয়ার হোসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা টানা ১১ ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনির পর  মাস শেষে তার পকেটে আসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বর্তমানে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি (৮.৭১%)। এমন ঊর্ধ্বগতির বাজারে ঘরভাড়া আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো মনোয়ারের কাছে এক দুঃসাধ্য লড়াই। তার ওপর যাতায়াত ও দুপুরের খাবারের খরচ বাদ দিলে অবশিষ্ট টাকায় কোনোমতে নুন-ভাতের দিন কাটে। মনোয়ারের আক্ষেপ কেবল অভাব নিয়ে নয়, বরং পেশাগত মর্যাদা নিয়ে। তিনি বলেন, “সারাদিন রাস্তায় রোদে পুড়ে কোম্পানির টার্গেট অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করি, কিন্তু আমরা শ্রমিক হিসেবেও গণ্য হই না। আমাদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই, কোনো বোনাস বা ছুটির নিশ্চয়তা নেই। অভিযোগ করার জায়গাও পাই না।” শ্রম আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিশাল ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’ বিক্রয়কর্মী বাহিনী আজও অধিকারবঞ্চিত।

শৈশব যখন প্যাডেলে বন্দী : গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে ভাগ্য ফেরাতে বগুড়া শহরে আসা ১২ বছরের নাহিদের গল্পটি আরও করুণ। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় অভাবের তাড়নায় বই ছেড়ে তাকে ধরতে হয়েছে রিকশার হ্যান্ডেল। ঋণের কিস্তি শোধ আর দায়িত্বহীন বাবার কারণে সংসারের হাল ধরতে প্রতিদিন সে রিকশা নিয়ে বের হয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশু শ্রমের হার বেড়ে ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে এই হার দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি (যথাক্রমে ১২.৪% ও ১১.৮%)।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা নাহিদ যেন এই পরিসংখ্যানেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। নাহিদ জানায়, দিনে ৪-৫ ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে যা পায়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসারের খরচ জোটে। যে বয়সে নাহিদের স্কুলে থাকার কথা, সেই বয়সে সে ট্রাফিক সিগন্যালে জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি। তার কাছে মে দিবস মানে কেবলই দু’পয়সা বাড়তি আয়ের স্বপ্ন।

এই বিষয়ে আঞ্চলিক শ্রম দপ্তর বগুড়ার উপ-পরিচালক মির্জা ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমাদের দেশের শ্রম আইনে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মনোয়ারদের মতো বিক্রয় প্রতিনিধিদের অনেকে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের সংজ্ঞায় পুরোপুরি পড়েন না, যার ফলে তারা সুরক্ষা পান না। তাদের ট্রেড ইউনিয়ন নেই বলেই এই অবস্থা। তবে ট্রেড ইউনিয়নের আওতাভুক্ত কোনো শ্রমিক চাকরিচ্যুত হলে তিনি যদি আমাদের কাছে আবেদন করেন আমরা তদন্ত করে তার পক্ষে ব্যবস্থা নেই। বগুড়া শ্রম দপ্তরের আওতাভুক্ত জয়পুরহাট ও গাইবান্ধা জেলার শিশু শ্রমিকরা। কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও অধিদপ্তর বগুড়ার শিশুশ্রম নিয়ে কাজ করে, এটি তাদের আওতায় নয় বলে তিনি জানান।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বগুড়ার উপমহাপরিদর্শক মাসুদ রানা বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী শিশুশ্রম মুলত দুই প্রকার। প্রাতিষ্ঠানিক শিশুশ্রম এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক শিশ্রশ্রম। ইজিবাইক বা কৃষিকাজে যেসব শিশরা জড়িত এরা অপ্রাতিষ্ঠানিক শিশু শ্রমিক। সব শিশুরাই দারিদ্রতার কারণে শিশুশ্রমে জড়িত হলেও আসলে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের জন্য করার তেমন কিছু নেই। দারিদ্র্যের মূল উৎপাটন না হলে এদের রিকশা থেকে নামানো কঠিন।

আরও পড়ুন

আজকের এই দিনে শ্রমিকদের যে অধিকারের কথা আমরা শুনি, তার সূচনা হয়েছিল ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। তখন শ্রমিকদের দিনে ১৪-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর শিকাগোর হে মার্কেটে পুলিশ গুলি চালালে বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারান। এই আত্মত্যাগের বিনিময়েই ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে-কে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শিকাগোর সেই রক্তঝরা সংগ্রামের দেড়শ বছর পার হতে চললেও মনোয়ার বা আতিকদের জীবনের চিত্র খুব একটা পাল্টায়নি। একজন ন্যায্য পারিশ্রমিক আর স্বীকৃতির অভাবে ধুঁকছেন, অন্যজন শৈশব হারিয়ে নিয়তির শিকারে পরিণত হয়েছে। মে দিবসের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন শ্রম আইন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে মনোয়ারদের মতো প্রান্তিক কর্মীদের সুরক্ষা দেবে এবং আতিকদের মতো শিশুদের রিকশার প্যাডেল ছেড়ে আবার স্কুলে ফেরার সুযোগ করে দেবে। কেবল একদিনের র‌্যালি বা শোভাযাত্রায় শ্রমিকদের মুক্তি নেই, মুক্তি আছে তাদের মর্যাদাপূর্ণ শ্রমে।

 

 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মে দিবস তাদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের লাল তারিখ

ইসলামী আন্দোলন গুপ্ত রাজনীতি করে না: ফয়জুল করীম

কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন অভিনেতা সিদ্দিক

মোহাম্মদপুর থানার ৩ পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহার

হবিগঞ্জে শয়নকক্ষে বেকার শ্রমিকের ঝুলন্ত মরদেহ

সংগঠনে থাকাবস্থায় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই: ছাত্রশিবির