ভিডিও শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৩১ দুপুর

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি

ইসলামাবাদে অপেক্ষা করছে কূটনৈতিক গোলকধাঁধা

ইসলামাবাদে অপেক্ষা করছে কূটনৈতিক গোলকধাঁধা, ছবি: সংগৃহীত।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ‘সদিচ্ছা থাকলে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো হবে। কিন্তু ভিন্ন কৌশল নিলে কোনো সদয় মনোভাব দেখানো হবে না।’ গতকাল শুক্রবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে এমন হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের সঙ্গে সংলাপে তিনি মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দিলেও গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত ইরানের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আলোচকদের আগমনের বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় আজ শনিবার নির্ধারিত সংলাপ শুরু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ জমেছে। উত্তেজনায় আঁচ বাড়াচ্ছে একে অপরের বিরুদ্ধে তোলা ‘ভঙ্গুর’ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ।ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তাদের অংশগ্রহণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের ওপর নির্ভর করতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল বলেন, ‘যুদ্ধ অবসানের আলোচনা এগিয়ে নেওয়া নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে তাদের যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি কতটা মেনে চলছে তার ওপর।’ ইরানি কর্মকর্তা আরও বলেন, ইসরায়েলি হামলা পাকিস্তানের এই আলোচনাকে ‘অর্থহীন’ করে তুলেছে।

তেহরানের দাবি, লেবাননকেও যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন এ দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ ছাড়া, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালিও খুলে দেওয়ার কথা ছিল। তা বাস্তবায়ন হয়নি দাবি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। লেখেন, ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে খুবই বাজে কাজ করছে।বিবদমান দুই পক্ষ আলোচনায় বসার আগে বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকলেও ইসলামাবাদ একটি উচ্চ পর্যায়ের সংলাপের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ বাণিজ্যসহ বেশ কিছু সংবেদনশীল বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

কূটনৈতিক গোলকধাঁধা

পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডন বলছে, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সংলাপ যদি হয়ও, তবে ইসলামাবাদ এক কূটনৈতিক গোলকধাঁধার সাক্ষী হবে। প্রথমত, গত ফেব্রুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় হওয়া বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানের মুখোমুখি হয়েছিল, সেই ইরান আর আগের মতো নেই। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে মেনে নিতে হবে। 

জেনেভার ওই বৈঠকের সময় ইরান আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্ন এবং অর্থনৈতিক ধসের মুখে ছিল। কিন্তু এখনকার ইরান আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য অনেকটা নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছে। ডন লিখেছে, দেশটি এখন জানে তারা কী কী দাবি করার অধিকার রাখে। ঠিক সে কারণেই ১০ দফা প্রস্তাব তুলে ধরছে। যার মধ্যে আছে– পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের অধিকার, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ। এসব দাবিই ইঙ্গিত দেয়, তেহরান তাদের দরকষাকষির সক্ষমতা অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। সামরিক শক্তি, আঞ্চলিক মিত্রতা এমনকি বিশ্বের নানা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা দেশটির নামেও ১৫টি দফা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। যেগুলো ইরানের দাবির অনেকটাই বিপরীত। ডন লিখেছে, এ অবস্থায় শান্তি আলোচনার সফলতা নির্ভর করবে উভয় পক্ষ তাদের মতপার্থক্য কতটা কমিয়ে আনতে পারবে তার ওপর। 

কিন্তু যদি এ আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন করে শুরু হতে যাওয়া সম্ভাব্য সংঘাত ভিন্ন মাত্রা পাবে। গত এক মাসের যুদ্ধে দুই দেশই নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে। ফলে নতুন উত্তেজনার আঁচ আগের চেয়ে অনেক ভয়াবহ ও বিস্তৃত হবে বলে লিখেছে ডন। গণমাধ্যমটি আরও লিখেছে, চলমান যুদ্ধবিরতি দুই দেশের ক্ষমতার একটি নতুন কাঠামো উন্মোচন করেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে ফলাফল নিয়ন্ত্রণের আশা করতে পারে না। ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের ছোট পদক্ষেপও বিশ্ব ব্যবস্থা ও অর্থনীতির আচরণ বদলে দিতে পারে। 

এই নতুন বাস্তবতায় কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়– সেটির পরীক্ষা ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। ডন লিখেছে, সম্ভাব্য আলোচনার টেবিলে বসতে যাওয়া পক্ষগুলো নতুন বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ কতটা মোকাবিলা করতে পারবে, নাকি ভুল পথে পা বাড়াবে– সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন

পর্দার আড়ালে চীন?

বৈঠকসংশ্লিষ্ট পাকিস্তানি সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল এএফপি তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করেছে চীন। বৈঠক ফলপ্রসূ হলে সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ চুক্তির ‘গ্যারান্টার’ বা জামিনদার হওয়ার জন্যও বেইজিংকে অনুরোধ করা হয়েছে।

একটি কূটনৈতিক সূত্র এএফপিকে বলেছে, নৌ-চলাচল, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য বিষয়ে দুই পক্ষকে আলোচনায় সহায়তা করার জন্য পাকিস্তান একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে। এই বিশেষজ্ঞ দলের কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, পাকিস্তান আলোচনার পরিবেশ তৈরি করলেও সবার নজর এখন চীনের ভূমিকার দিকে।

আরেকটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছেন, চীনকে সম্ভাব্য চুক্তির জামিনদার হওয়ার অনুরোধ করার কারণ ইরান। তারা একজন শক্তিশালী গ্যারান্টার চায়। প্রধান বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার নাম আসার সুযোগ থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমাদের কাছে মস্কোর গ্রহণযোগ্যতা কম। ফলে চীনই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক বিকল্প।

সংলাপসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, চীন আনুষ্ঠানিকভাবে জামিনদারের ভূমিকা গ্রহণ করবে কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। একটি সূত্র এএফপিকে বলেছে, ‘তাদের (চীন) নিজস্ব কিছু বিবেচনা আছে। তারা জনসমক্ষে এই সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে চায় না।’ 

পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান মুশাহদ হোসেন সৈয়দ বলেন, ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং প্রতিবেশী হিসেবে যুদ্ধের অবসানে পাকিস্তান ও চীন প্রথম দিন থেকেই নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে আসছে। যেহেতু তেহরান ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করে না, তাই চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রধান জামিনদার হিসেবে চীনের ভূমিকা অপরিহার্য।

এএফপি লিখেছে, বিবদমান পক্ষগুলোর অবস্থানের মধ্যে বিশাল ব্যবধান থাকায় এই আলোচনাকে একটি কঠিন লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ঐকমত্যে পৌঁছাতে হলে সব পক্ষকেই কঠিন কিছু বিষয়ে আপস ও ছাড় দিতে হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইসলামাবাদে অপেক্ষা করছে কূটনৈতিক গোলকধাঁধা

পাকিস্তানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠক মুসলিম বিশ্বের জন্য গর্বের: শাহবাজ শরীফ

সব শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছে সরকারি দল : জামায়াত আমির

লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টারের পদত্যাগ

ইরানের নেতাদের শুধু আলোচনার জন্য বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে : ট্রাম্প

আরব সাগরে জাহাজ থেকে বাংলাদেশিসহ ১৮ নাবিক উদ্ধার