দেশে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব, বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা, ২১ শিশুর মৃত্যু, ১৫ জনই রাজশাহী বিভাগের
নাসিমা সুলতানা ছুটু : বগুড়াসহ সারা দেশে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। বায়ুবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী রোগী সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকের চেম্বারে যাচ্ছেন। এমন কী এই রোগে আক্রান্ত কেউ কেউ ছুটছেন হোমিও চিকিৎসকের কাছেও। ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশে ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দেশের অন্তত ১০টি জেলায় হাম রোগ উদ্বেগজনকভাবে সংক্রমিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলায় সংক্রমণ বেশি। অন্য কিছু জেলায়ও শিশুরা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছে। চলতি মাসে হামে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩জন, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৩জন ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ৩জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বগুড়া জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ১১টি উপজেলায় ৩৬ জন সম্ভাব্য হাম আক্রান্ত রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে ৫জন শিশু ভর্তি রয়েছে। এছাড়া টিএমএসএস রফাতুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত ৩ শিশু চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ১২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শিশু এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহে মারা গেছে তিন শিশু। পাবনায় গত শনিবার ২৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বগুড়া জেলার সিভিল সার্জন ডা. খুরশিদ আলম জানান, বগুড়ার ১১ উপজেলায় সম্ভাব্য হামের ৩৬জন রোগী পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে পাঠানো নমুনা থেকে ২৫ জনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ১জনের পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে, ১১জনের রিপোর্ট পেন্ডিং রয়েছে। এছাড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ৫জন সম্ভাব্য হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে বলে ডা. খুরশিদ জানান।
এদিকে শজিমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. মনজুর এ-মুর্শেদ জানান, গতকাল রোববার বিকেল পর্যন্ত ওই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে তিনজন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। এদের মধ্যে পাঁচ ও সাত মাস বয়সী দুই শিশু আগে থেকেই ভর্তি ছিলো সাত মাস বয়সী আরেক শিশু গতকাল রোববার দুপুরে ভর্তি হয়েছে।
বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম জানান, গতকাল ওই হাসপাতালে শরীরে র্যাশসহ হামের অন্যান্য চিহ্ন নিয়ে ভর্তি হলে শিশুটিকে পরে শজিমেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
বগুড়া টিএমএসএস’র উপ-নির্বাহী পরিচালক ডা. মতিউর রহমান জানান, হামে আক্রান্ত হয়ে টিএমএসএস হাসপাতালে রোজার আগে তিন শিশু ভর্তি হয়েছিলো। তারা চিকিৎসা নিয়ে ঈদের আগেই বাড়ি ফিরেছে।
শিশুদের পাশাপাশি বড়োরাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গত শুক্রবার থেকে প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী সাবা আমরিন নামে এক নারী হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন হোমিও চিকিৎসকের। সাবা জানান, তার স্বামীর চাকরি সূত্রে ঢাকায় থাকেন। বাবা ও শ্বশুর বাড়ি বগুড়ায়। ঈদের দুইদিন পর ঢাকা থেকে বগুড়ায় এসেছেন। আসার পর থেকেই গায়ে হাল্কা জ্বর ও সর্দি-কাশি ছিলো। শুক্রবার রাতে হঠাৎই তার মুখে তিন-চারটে র্যাশ দেখতে পায়।
পরের দিন সকালে সেই র্যাশ পুরো মুখমন্ডলসহ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সাবা বলেন, আমিসহ পরিবারের সবার ধারণা এটা হাম। যেহেতু আমার দশ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে এবং সে বুকের দুধ পান করে তাই এ্যালোপাথিক চিকিৎসা না নিয়ে হোমিও চিকিৎসকের ওষুধ এনে খাচ্ছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্তদের প্রথম ৩ থেকে ৪ দিন জ্বর-সর্দি-কাশি দেখা দেয়। তারপর ৪ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। সারতে ২ সপ্তাহ সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা বুঝে ওঠার আগেই (দ্বিতীয় সপ্তাহ) রোগীর জটিলতা শুরু হয়। ৯০ ভাগ রোগীর নিউমোনিয়া, ৬০ থেকে ৭০ ভাগের ডায়রিয়া, ৫০ ভাগের কনজেক্টিভাইটিস (চোখে সংক্রমণ) হয়।
আরও পড়ুনএছাড়া স্বল্পসংখ্যক রোগীর সেলুলাইটিস (র্যাশজনিত ইনফেকশন), রক্তে সোডিয়াম (লবণ) কমে যাওয়া, কিডনি ও হার্ট ফেইলিউর, এনকেফাইলাইটিস (মস্তিষ্কে টিস্যুর প্রদাহ) ও খিঁচুনি হয়। হামের লক্ষণ শুরুর ১০ দিনের মধ্যে নমুনা নিয়ে ‘এলিসা আইজিএম’ পরীক্ষায় রোগটি ধরা পড়ে। বর্তমানে নমুনা পরীক্ষার অধিকাংশই পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে।
আক্রান্ত শিশুদের ৯০ শতাংশই ১ বছরের কম বয়সি, যাদের বেশির ভাগই টিকা নেয়নি। পরীক্ষায়-নিরীক্ষায় প্রাপ্তবয়স্কদেরও হাম পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। ফলে ২ বছরের কম বয়সি শিশু টিকা নিক বা না নিক তাদের ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে।
হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কার্যক্রমে ৯ ও ১৫ মাস বয়সি প্রত্যেক শিশুকে দু‘বার বিনামূল্যে হামের টিকা দেওয়া হয়। প্রোগ্রামের আওতায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ শিশু টিকা পায়। ১০ থেকে ২০ শতাংশ টিকার আওতায় আসে না। অভিভাবকদের অসচেতনতায় সময়মতো টিকা ও বুস্টার ডোজ না দেওয়ায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়।
এছাড়া ইপিআই প্রোগ্রামে বছরব্যাপী ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের মধ্যে প্রতি ৫ বছরে একটি আলাদা টিকা ক্যাম্পেইন হয়। সরকারের প্রস্তুতি থাকলেও বিভিন্ন কারণে ২০২৪ সালে ক্যাম্পেইনটি হয়নি। করোনাভাইরাস মহামারিতে টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার পতনসহ নানা অস্থিরতায় মাঝখানে টিকার সংকট ছিল।
প্রতিবছর বাদ পড়া শিশুদের (১০ থেকে ২০ শতাংশ) একত্র করলে ৫ বছরে প্রায় ৮০ শতাংশের মতো হয়। ফলে ৫ থেকে ৬ বছর অন্তর দেশে হামের পিক (চূঁড়ায় পৌঁছায়) হয়। এর আগে ২০১৯ সালে এমন হয়েছিল। রোগটি দ্রুত ও উচ্চ সংক্রমণ হওয়ায় সাধারণত রোগীদের অন্য হাসপাতাল ভর্তি নেয় না। সম্প্রতি ঈদকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক জনসমাগম হয়েছে। এটাও সংক্রমণ বাড়াতে পারে।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টিকার সংকট দূর না করা এবং বিভিন্ন দাবিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলন।
এদিকে আমাদের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চলতি মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে ২৬ মার্চ ল্যাব পরীক্ষায় ৭৭ জনের শরীরে হামের জীবাণু নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। রাজশাহী স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত বিভাগজুড়ে মোট ৩৪২ জনকে হামে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। শতকরা আক্রান্তের হার ২২ দশমিক ৫১ শতাংশ। এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পাবনা প্রতিনিধি জানান, পাবনার হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৭ জন। পাবনা জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭ জন। আর গত সাতদিনে জেলায় ২৩ জন হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এছাড়া গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১১৮ জন। অন্যদিকে, বর্তমানে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ২৭ জন রোগীর মধ্যে ৩ মাস থেকে ১২ মাস বয়সী শিশু রয়েছে ২৫ জন। আর মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি দু'জন যুবকের মধ্যে একজনের বয়স ২২ বছর অন্যজনের বয়স ৩২ বছর।
মন্তব্য করুন








_medium_1774793055.jpg)
