ভিডিও বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ২৫ মার্চ, ২০২৬, ০৯:৫৭ রাত

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নাব্য হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে করতোয়া নদী

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নাব্য হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে করতোয়া নদী

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: এক সময় যার বুক চিরে ছুটে চলত বিশাল পণ্যবাহী নৌযান, যার উত্তাল ঢেউয়ের গর্জনে প্রকম্পিত হতো দুই কূল-সেই প্রমত্ত করতোয়া আজ কেবলই ইতিহাসের স্মৃতি। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জনপদ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদী এখন নাব্য হারিয়ে মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়েছে।

পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং দূষণের কবলে পড়ে নদীটি তার প্রাচীন রূপ, গৌরব ও প্রাণশক্তি হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত। করতোয়া নদীর উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে করতোয়া ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক নৌপথ।

মধ্যযুগে ‘সরকার ঘোড়াঘাট’ ছিল প্রশাসনিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যা এই নদীকেই ঘিরে গড়ে ওঠে। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও কলকাতা থেকে বড় বড় মহাজনী নৌকা এই নদীপথে ঘোড়াঘাটে আসত। পাথর, কয়লা, চাল-ডালসহ নানা কৃষিপণ্য পরিবহনে করতোয়ার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। নদীকেন্দ্রিক এই বাণিজ্য ব্যবস্থাই স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত রেখেছিল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শালিকাদহ, কুলানন্দপুর, সোনারপাড়া, কৃষ্ণরামপুর, ভর্ণাপাড়া, সাতপাড়া এবং ঘোড়াঘাট পৌরসভার বিভিন্ন অংশ জুড়ে করতোয়ার বিস্তীর্ণ তলদেশ এখন ধুধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে অল্প কিছুদিন পানি থাকলেও বছরের অধিকাংশ সময় নদীটি শুকনো থাকে।

কোথাও কোথাও সরু খালের মতো পানি প্রবাহিত হলেও তা নৌচলাচলের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীর তলদেশে জমেছে পলি। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য চর, যা ধীরে ধীরে নদীর মূল গতিপথ সংকুচিত করে ফেলছে।

করতোয়ার এই করুণ অবস্থার বহুমাত্রিক প্রভাব পড়েছে পরিবেশ ও জনজীবনে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই বন্যার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে নদীর পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ ফসলি জমি দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে। আকস্মিক এই বন্যায় কৃষকদের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে বারবার। ফলস্বরূপ, ফসলের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত হচ্ছেন কৃষকরা।

আরও পড়ুন

একসময় নদীতে প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন পানি না থাকায় মাছ প্রায় বিলুপ্ত। ফলে শত শত জেলে পরিবার পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। নদীতে পানি না থাকায় আশপাশের এলাকায় পানির পুন:ভরণ কমে গেছে, ফলে নলকূপে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সেচের জন্য কৃষকদের এখন গভীর নলকূপ বা ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নদীভিত্তিক উদ্ভিদ ও প্রাণি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। স্থানীয় জলবায়ুতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড দিনাজপুর এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, দিনাজপুর জেলার সার্বিক নদী ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি সমীক্ষা প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন নদীর নাব্যতা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে কোন কোন নদীতে খনন কার্যক্রম প্রয়োজন এবং কোথায় ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি-তা নির্ধারণে বিস্তারিত জরিপ পরিচালনা করা হবে।

তিনি আরও জানান, আগামী জুন মাস থেকে এই সমীক্ষার কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে টেন্ডারের মাধ্যমে অভিজ্ঞ কনসালটেন্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা সমীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় নকশা ও সুপারিশ প্রস্তুত করে জমা দেবেন।

পরবর্তীতে সেই সুপারিশের ভিত্তিতে একনেক বা পরিকল্পনা কমিশনে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে পরবর্তী ধাপে নদী খনন ও ভাঙন রোধে কার্যকর কাজ শুরু করা হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নাব্য হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে করতোয়া নদী

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা : শিক্ষামন্ত্রী

বগুড়ায় খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে তিনমাথায় দেশি ফলের আড়তে অপ্রীতিকর ঘটনা

সিআইডি প্রধান হিসেবে যোগ দিলেন মোসলেহ্ উদ্দিন

বগুড়ার সোনাতলায় রাস্তার গাছ অবাধে কাটা হচ্ছে : স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ

বগুড়ার আদমদীঘিতে অতিরিক্ত দামে মাংস বিক্রি ৬ ব্যবসায়ীকে জরিমানা