ভিডিও শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১২ মার্চ, ২০২৬, ০৭:০৮ বিকাল

লাইলাতুল কদর কেন গোপন রাখা হয়েছে?

লাইলাতুল কদর কেন গোপন রাখা হয়েছে?

লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এ রাতেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছিল। কোরআনে ওই রাতের ফজিলত আলোচিত হয়েছে দুটি জায়গায়। সুরা দুখানের শুরুতে আল্লাহ বলেছেন, শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। নিশ্চয় আমি এটি নাজিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী।

সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয় আমার নির্দেশে। নিশ্চয় আমি রাসূল প্রেরণকারী। তোমার রবের কাছ থেকে রহমত হিসেবে; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা দুখান: ২-৬)

সুরা কাদরে আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি এটি নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে।’ তোমাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল কদর’ কী? ‘লাইলাতুল কদর’ হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত। (সুরা কাদর: ১-৫)

এই মহিমান্বিত রাত রমজানেরই কোনো একটি রাত হওয়ার ব্যাপারটি সুনিশ্চিত। যেহেতু কোরআনের অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে কোরআনে রমজান মাসে নাজিল হয়েছে। আল্লাহ বলেন, রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। (সুরা বাকারা: ১৮৫)

কিন্তু রমজানের কোন রাতটি ‘লাইলাতুল কদর’ তা সুনির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হয়নি। একাধিক বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশকেরই একটি রাত। যে কারণে তিনি রমজানের শেষ দশকটি ইতেকাফে কাটাতেন।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন এবং বলতেন, আপনারা লাইলাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশকে অনুসন্ধান করুন। (সহিহ বুখারি: ২০২০, সহিহ মুসলিম: ১১৬৯)

আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল, তারপর আমার পরিবারের একজন আমাকে জাগিয়ে দিলেন, ফলে আমি তা ভুলে গেলাম। আপনারা লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশ রাতে অনুসন্ধান করুন। (সহিহ মুসলিম: ১১৬৬)

কিছু বর্ণনায় নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে আপনারা লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করুন। (সহিহ বুখারি)

অর্থাৎ রমজানের শেষ দশকের যে কোনো একটি রাত অথবা ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের দিবসপূর্ব রাতগুলোর কোনো একটি রাত লাইলাতুল কদর।

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তে লাইলাতুল কদর গোপন রাখা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্যই। প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) তার তাফসিরগ্রন্থ আত-তাফসিরুল কাবিরে লাইলাতুল কদর গোপন রাখার কিছু হেকমত উল্লেখ করেছেন:

এক. আল্লাহ তাআলা অনেক বিষয়ই তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তে গোপন রেখেছেন। যেমন—তিনি ইবাদতের মধ্যে নিজের সন্তুষ্টি গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ সব ধরনের ইবাদতের প্রতিই আগ্রহী হয়। গুনাহের মধ্যে তাঁর অসন্তোষ গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ সব ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকে। মানুষের মাঝে তাঁর প্রিয় বান্দাদের গোপন রেখেছেন, যাতে সবাইকে সম্মান করা হয়। দোয়ার মধ্যে কবুল হওয়ার মুহূর্ত গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ অধিক পরিমাণে দোয়া করে।

আরও পড়ুন

তার সম্মানিত নামসমূহের মধ্যে তিনি ইসমে আজম গোপন রেখেছেন, যেন তাঁর সব নামকেই মর্যাদা দেওয়া হয়। তিনি মধ্যবর্তী নামাজ গোপন রেখেছেন, যেন সব নামাজেরই যত্ন নেওয়া হয়। তওবা কবুল হওয়ার সময় গোপন রেখেছেন, যাতে বান্দা সব সময় তওবা করতে থাকে। মৃত্যুর সময় গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত থাকে।

একইভাবে তিনি লাইলাতুল কদর গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ রমজানের প্রতিটি রাতই গুরুত্বের সঙ্গে ইবাদত করে কাটায়।

দুই. যদি আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদরের রাত নির্দিষ্ট করে দিতেন, তাহলেও কেউ কেউ সেই রাতে প্রবৃত্তির তাড়নায় গুনাহে লিপ্ত হতো। তখন জেনে-শুনে সেই রাতে গুনাহ করা অজ্ঞাতসারে গুনাহ করার চেয়ে অনেক গুরুতর হয়ে যেত। তাই বান্দাদের প্রতি দয়া করেই আল্লাহ তাআলা এ রাতকে গোপন রেখেছেন।

একটি বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন মসজিদে প্রবেশ করে একজনকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি আলীকে (রা.) বললেন, তাকে জাগিয়ে দাও, যেন সে অজু করে।

আলী (রা.) তাকে জাগালেন। পরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো সব সময় সৎকর্মে অগ্রগামী। তাহলে আপনি নিজে তাকে জাগালেন না কেন?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যদি সে তোমার কথার জবাবে উঠতে অস্বীকার করত, তাহলে তা কুফর হতো না। তাই আমি চাইনি তার অপরাধ গুরুতর হয়ে যাক।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যদি তার উম্মতের প্রতি এত দয়ালু হন, তাহলে আল্লাহ তাআলা কত বেশি দয়ালু হবেন তা সহজেই অনুমান করা যায়।

তিন. আল্লাহ তাআলা এই রাতকে গোপন রেখেছেন, যাতে বান্দা তা অনুসন্ধানের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে এবং সেই প্রচেষ্টার জন্যও অতিরিক্ত সওয়াব লাভ করে।

চার. বান্দা যেহেতু নিশ্চিতভাবে জানে না কোন রাতটি কদরের রাত, তাই সে রমজানের প্রতিটি রাতেই ইবাদতে যত্নবান হয়—এই আশায় যে হয়তো এ রাতই লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের সামনে তাদের নিয়ে গর্ব করেন এবং বলেন, তোমরা বলেছিলে, এরা পৃথিবীতে ফাসাদ করবে ও রক্তপাত ঘটাবে। অথচ দেখো, সম্ভাব্য একটি রাতের আশায় তারা কত আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদতে মগ্ন। যদি আমি এ রাতটি তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতাম, তবে তাদের অবস্থা কেমন হতো!

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাতে হজ ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী

কুষ্টিয়ায় ট্রাকের পেছনে পিকআপের ধাক্কায় ৩ ঘোড়াসহ ২ জন নিহত

বট বাহিনী আমাকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড বানায়, ট্রল করে : শিক্ষামন্ত্রী

ইন্দোনেশিয়ায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ৮ যাত্রীর সবাই নিহত

রাশেদ প্রধানের বাসার সামনে বিক্ষোভ, পিএস জনি নন্দীকে সরিয়ে নিলো পুলিশ

কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি সতর্ক বার্তা