ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একটি পর্যালোচনা
অবশেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস কথা রেখেছেন। ২০২৪ এর ৫ই আগষ্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ই আগষ্ট তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের প্রধান হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণের পর তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন তাঁর সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রায় ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিলেন, তারপর যথারীতি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ছিলো বাংলাদেশের সেই কাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে আরও ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেই সকল নির্বাচন সম্পর্কে কিছু জেনে আসা যাক। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সনে ৭ই মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিলো ৫৫.৬১%।
আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে ২৯৩টি আসনে বিজয়ী হন। সেই নির্বাচনে জাসদ পায় ১টি আসন, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ পায় একটি আসন আর স্বতন্ত্র পায় ৫টি আসন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয় ১১জন সংসদ সদস্য। ২য় নির্বাচন হয় ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সনে। ২য় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিলো ৪৯.৬৭%, সেই নির্বাচনে বিএনপি পায় ২০৭টি আসন, আওয়ামী লীগ মালেক পায় ৩৯টি আসন এবং মুসলিম লীগ ও আইডিএল একত্রে পায় ২০টি আসন। সংসদের ৩য় নির্বাচন হয় ৭ই মে’ ১৯৮৬ সনে, সেই নির্বাচনে ভোটের হার ছিলো ৬০.৩৭%। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩ আসন, আওয়ামী লীগ পায় ৭৬টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী পায় ১০টি আসন। সামরিক শাসনের অধিনে নির্বাচনে কারচুপি হবে এই কারণে বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করেন, মূলত বেগম খালেদা জিয়া এই নির্বাচন থেকেই আপসহীন নেত্রী হিসাবে মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নেয়। ৪র্থ নির্বাচন হয় ৩রা মার্চ’ ১৯৮৮, ভোটার ছিলো ৫৪.৯৩%। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয় দল নির্বাচন বর্জন করে। মোটামুটি এক তরফা নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ২৫১ আসন, সম্মিলিত বিরোধী দল পায় ১৯টি আসন। ৫ম নির্বাচন ২৭শে ফেব্রুয়ারি ’১৯৯১ সনে, ভোটার ছিলো ৫৫.৪৫%। অতীতের যে কোন নির্বাচন থেকে অধিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিলো এটি। ১৪০ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন, জাতীয় পার্টি পায় ৩৫ আসন এবং জামায়াত পায় ১৮ আসন। সকল বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ নির্বাচন হয়। সবচেয়ে কম ভোটার উপস্থিত হয় এই নির্বাচনে, মাত্র ২৬.৫৪%। ১২ই জুন’১৯৯৬ সনের ৭ম নির্বাচনে ১৪৬ আসন পায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি পায় ১১৬ আসন,জাতীয় পার্টি পায় ৩২টি আসন, জামায়াত পায় ৩টি আসন, ভোটার উপস্থিত হয় ৭৪.৯৬%। ৮ম নির্বাচন হয় ১লা আক্টোবর’ ২০০১ সনে, ভোটার ছিলো ৭৫.৫৯%। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি জোট পায় ২১৬ আসন এবং আওয়ামী লীগ পায় ৬২ আসন এবং জাতীয় পার্টি পায় ১৪ আসন। ৯ম নির্বাচন হয় ২৯শে ডিসেম্বর’ ২০০৮ সনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে এই নির্বাচনে ভোট পড়ে ৮৭.১৩%, বিরোধী দল বিএনপি পায় মাত্র ৩৩টি আসন। ১০ম নির্বাচন হয় ৫ই জানুয়ারি’ ২০১৪ সনে, ভোট পড়ে ৪০.০৪%। আওয়ামী লীগ ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অনেকে ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক নির্বাচন বলে এটি। দিনের ভোট রাতে হওয়ার নির্বাচন হয় একাদশ নির্বাচন, ৮০.২০% ভোট দেওয়া হয় এখানে। আওয়ামী লীগ একাই নেয় ২৫৮টি আসন, বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয় ২২টি আসন,আর বিএনপিকে দেওয়া হয় মাত্র ৬টি আসন। ৭ই জানুয়ারি’২০২৪ তারিখে আমি এবং ডামির নির্বাচন হয় ১২তম সংসদ নির্বাচন। ভোট পড়ে ৪১.৮১%। সব দলের বর্জনের মুখে আওয়ামী লীগ নিজেরা ভাগ হয়ে এই নির্বাচন করে, ফলে এই নির্বাচনের নাম হয় আমি আর ডামির নির্বাচন। ত্রয়োদশ নির্বাচন ছিলো ১২ই ফেব্রুয়ারি’ ২০২৬ সনে। এই নির্বাচনে বিএনপি নিরস্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মন্তব্য করছেন যে, যদিও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কারণে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে নাই তথাপি এই নির্বাচন ছিলো বাংলাদেশের একমাত্র নির্বাচন যেখানে নির্বাচনের দিন কোন খুন-খারাপি হয় নাই।
১৯৯১ সনে ভোটের সহিংসতায় ৪০ জন মানুষ মারা যায়। তাছাড়াও সকল সংসদ নির্বাচনেই কমবেশী রক্তপাত ছিলো, কিন্তু এই নির্বাচন ছিলো একটি ব্যতিক্রমি নির্বাচন। নির্বাচনে ৫৯.৪৪% ভোটার উৎসব মূখর পরিবেশে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগের প্রচার ছিলো নো বোট নো ভোট, তথাপি মানুষ বিশেষ করে গ্রামের মানুষ নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। আগের ভোটগুলোর পারসেন্টেস্ দেখলে এবারের ভোটটি কোন অংশেই অগ্রহণযোগ্য নয়। এবারের ভোটের উল্লেখযোগ্য দিক ছিলো নারী ভোটারদের সর্বোচ্চ উপস্থিতি। সাধারণত দেখা যেত স্থানীয় সরকারের ভোটে মেম্বার চেয়ারম্যানরা নিজ উদ্যোগে এবং নিজ খরচায় ভোটারদের বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে যেত কিন্তু এবার মহিলা ভোটারা নিজ উদ্যোগে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ভোট দিয়েছে, যেটা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ। শুনেছি বিদেশী নাগরিক গিলবার্ট ভোটের সময়ে নিজের টাকায় বিমান ভাড়া দিয়ে ভোট দিতে দেশে যেত, এখন দেখছি বাংলাদেশেও একই অবস্থা, যেটা একটি ভালো দিক। এবারের ভোটে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় জাতীয় পার্টি একটি আসনও পায়নি, সম্ভবত লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি করার কারণে জনগণ তাদেরকে ট্রামকার্ড দেখিয়াছে। ভোটার উপস্থিতি দেখে পরিশেষে বলা যায় একটি বৃহৎ দলের অংশগ্রহণ ব্যতিত নির্বাচন হলেও একটি সফল নির্বাচন তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
লেখক
আরও পড়ুনএড. মোঃ মোজাম্মেল হক
উপদেষ্টা, বগুড়া জেলা বিএনপি।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








