নওগাঁর বদলগাছীতে ভ্যান ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত ১
বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি : নওগাঁর বদলগাছীতে ভ্যান ছিনতাইয়ের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে ধরে থানায় নেয়ার পথে গণপিটুনির শিকার হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর বাজার এলাকা থেকে থানা মোড় এলাকায় এই গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। পরদিন রোববার (১ নভেম্বর) সকালে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা যান তিনি। নিহত ব্যক্তির নাম হায়দার আলী (৫০)। তিনি জয়পুরহাট জেলার ভাতশা ইউনিয়নের দেওনাহার গ্রামের মৃত কহির উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ অক্টোবর দুপুরে বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের বারাতৈল গ্রামের ভ্যানচালক সৌমিককে ৩০০ টাকা ভাড়ায় বদলগাছী নতুন ব্রিজ থেকে আক্কেলপুরে নিয়ে যান হায়দার আলীসহ কয়েকজন। সেখানে বিভিন্ন কৌশলে সৌমিককে দুপুরের খাবার খাওয়ানো হয়। একপর্যায়ে সৌমিক ঘুমিয়ে পড়লে তার চার্জার ভ্যানটি নিয়ে পালিয়ে যান হায়দার আলীসহ কয়েকজন।
এ ঘটনায় আক্কেলপুর মোড়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে আক্কেলপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা। পরে ফুটেজে থাকা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার ভ্যানের সন্ধানে সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা বদলগাছী থানায় যান। সেখানে সিসিটিভি ফুটেজ দেখার সময় পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এলাকা থেকে থানায় সেবা নিতে আসা কয়েকজন ব্যক্তি হায়দার আলীকে ছবি দেখে শনাক্ত করেন। তারা জানান, ওই ব্যক্তিকে কিছুক্ষণ আগে পাহাড়পুর মোড়ে দেখা গেছে। পরে সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা পাহাড়পুর বাজারে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন।
এরপর হায়দার আলীকে ধরে ভ্যানে করে বদলগাছী থানায় নিয়ে আসছিলেন তারা। থানার মোড়ে পৌঁছালে হায়দার আলী ভ্যান থেকে লাফ দিয়ে হাটের ভেতর পালানোর চেষ্টা করেন। এসময় সৌমিকের বাবা সামছদ্দিন ‘চোর পালাচ্ছে’ বলে চিৎকার করেন। এরপর বাজারে উপস্থিত লোকজন তাকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে তাকে মাইক্রোস্ট্যান্ডের একটি চৌকিতে বসানো হলেও সেখানেও আবার মারধর করা হয়।
গুরুতর আহত ও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে পুলিশের কাছে নিয়ে যান সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা। পরে বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখান থেকে পুলিশের সহযোগিতায় আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় তাকে। শনিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে সেখানে ভর্তি করা হয় হায়দার আলীকে। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হায়দার আলীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে বদলগাছীতে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
আরও পড়ুনঘটনার বিষয়ে জানতে গত শনিবার রাতে বারাতৈল গ্রামে সৌমিকের বাড়িতে গেলে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে সৌমিকের বাবা সামছদ্দিন ও তার মা শিল্পী এবং সৌমিকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ভ্যান হারানোর পর তারা থানায় গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করেন। পরে পাহাড়পুর বাজার থেকে তাকে ধরে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। সামছদ্দিন বলেন, চোর পালাচ্ছে বলে চিৎকার দিলে হাটের লোকজন তাকে মারধর করেন। আমরা তাকে মারিনি। হাটের অনেক লোক তাকে মারধর করেছে। আমরা কাউকে চিনি না। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে থানা পুলিশ ও যুবদল নেতা মুমিনুল ইসলাম মুন্না, আকরাম, রাইহানের সাহায্যে হাসপাতালে ভর্তি করাই। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই।
আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নাজমুল হক বলেন, শনিবার রাতে গুরুতর আহত অবস্থায় হায়দার আলীকে হাসপাতালে আনা হয়। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধরের গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকালে তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে নিহত হায়দার আলীর ভাতিজা পুলিশ সদস্য সবুজ হোসেন দাবি করেন, তার চাচা আগে কখনো চুরি বা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তার পরিবারে কেউ নেই। সে হলো ভবঘুরে। তাকে গনপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে তার মরদেহ জয়পুরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। ময়নাতদন্তের পর এ ঘটনায় বদলগাছী থানায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আক্কেলপুর থানার পরিদর্শক মেহেদী মাসুদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ভ্যান ছিনতাইয়ের ঘটনায় সৌমিকের পরিবার থানায় জিডি করেছিল। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হায়দার আলীকে শনাক্ত করেন তারা। থানায় নেওয়ার সময় তিনি পালানোর চেষ্টা করলে উপস্থিত জনতা তাকে মারধর করে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মন্তব্য করুন

_medium_1793600782.jpg)
_medium_1793598765.jpg)
_medium_1793596752.jpg)




_medium_1793603379.jpg)
_medium_1793599473.jpg)