ভিডিও বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:১৩ পিএম

অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম

বগুড়ার বচন

বগুড়ার বচন

মানুষ, পরিবার, সমাজ, জাতি, অঞ্চল, দেশ, মহাদেশকে ইতিহাস আসল এবং আদত অবহিত করে উন্নয়নের দিক নির্দেশনা এবং ভিত মজবুত করে। আমি ছাত্রজীবনে ইতিহাস পড়ার সুযোগ না পেয়ে বলতে গেলে কিছুটা দিক নির্ণয়হীন চলছি। শিক্ষা জীবনে মন দিয়ে, দরদ দিয়ে উদ্ভিদবিদ্যা রপ্ত করে দেড় দশক সরকারি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় রত থাকাকালে জীবনের মরণ সন্ধিকালে মহান সৃষ্টিকর্তা তথা প্রকৃতির প্রতি দেওয়া  প্রতিশ্রুতি আমাকে শঙ্কিত করত, ভীতসন্ত্রস্ত করলে সরাসরি মানব সেবাকরণের নিমিত্তে ১৯৬৪ সালে ভূমিহীন ভিখারিদের দ্বারা জন্ম নেওয়া টিএমএসএস-এর ১৯৮০ সালে হাল ধরে যা পেয়েছিলাম অদম্য আশা আকাঙ্ক্ষা, মানবিক শক্তি, অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি এবং সীমাহীন দরিদ্র্যতা, সম্পদহীনতা। সেই অবস্থা থেকে উত্তরবঙ্গের কেন্দ্রস্থল বগুড়ার এই বেসরকারি সংস্থার সম্ভাবনায় আমি শানিত ছিলাম। বর্তমানে সংস্থার কার্যক্রম সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত, দেশের কার্যক্রম এবং স্টেকহোল্ডারগণকে অগ্রাহ্য করলে অন্যায় হবে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে জন্ম নেওয়া বগুড়া জেলায় আমার জন্ম। জন্মভূমিকে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। তাই ইতিহাস না জানালেও বগুড়ার উন্নয়নের প্রতি আকুতি হয়ে অতীত আবৃত্তি করতেই হয়। 

১৮২১ সালে দিল্লির মসনদপুষ্ট সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পুত্র নাসিরুদ্দিন বগরা খানের নাম স্মরণে বগুড়ার নামকরণ। মহাস্থানগড়ের প্রাচীন পুন্ড্রনগর বা পুন্ড্রবর্ধন নামক অভাবনীয় সভ্যতার লীলাভূমি যেখানে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ ও তৃতীয় শতক থেকে সভ্যতা তথা নগর জীবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন অবিভক্ত বাংলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল বগুড়া। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কৃষি, কারখানা অভাবনীয় উৎপাদনে সে কাল থেকেই এই জনপদ ছিল উর্বর। প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন সভ্যতা মৌর্য ও গুপ্ত যুগ, পাল রাজবংশ, সেন রাজবংশ, সুলতানি শাসন, মোঘল শাসন, ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানের বঞ্চনার শাসন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিবেচনায় বগুড়ার ইতিহাস বৈচিত্র্যময় বর্ণাঢ্য প্রাচীন ও ঘটনাবহুল। বগুড়ার জনপদের ন্যায্য অধিকার এখনও উপেক্ষিত।

ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস) নামক জাতীয় ভিত্তিক সংস্থা পরিচালনা করতে গিয়ে অধিকার আদায়ের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বঞ্চনাকারী অপেক্ষা বৈষম্যগ্রস্তকেই দুরস্ত করে চলছে। বগুড়ার ইতিহাস, জনবহুলতা, জনআকাঙ্ক্ষা, জনগণের পারঙ্গমতা বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় অপার সুযোগের মহানগর ঢাকা, চট্টগ্রাম এর পরেই বগুড়া মহানগরের স্থান। ৬৪ জেলা চষে বেড়ে দেখেছি বগুড়ার মানুষকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হয় না। অন্য জেলার মানুষকে অন্তহীন উদ্বুদ্ধকরণে লেগে থাকলেও উদ্যোক্তা বানানো যায় না।

এই হেনকালের অর্থাৎ স্বাধীনতা পূর্ব বগুড়ার শিল্প সংস্কৃতি, উন্নয়ন ইন্ডাস্ট্রি কলকারখানার উৎপাদনের নিমিত্তে কসকো সাবান, জানেসাবা সাবান, বিশ্বখ্যাত সেন্টেড সিগারেট, কটন স্পিনিং মিলের কাপড়, কম্বল- ইউরোপ আমেরিকায় রপ্তানি হতো। তাজমা সিরামিক, গ্লাস, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন মেটাল তৈজসপত্র, নানা আকারের গার্মেন্টস, বিশাল আকারের চামড়া প্রক্রিয়াজাত ট্যানারি শিল্প, দুগ্ধ খাদ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প সেকাল থেকেই বগুড়ায় এগুলো ছিল। বর্তমানে সেই অনুপাতে বিভিন্ন শাসকের বগুড়া বর্জন নীতি শুধু বগুড়াকে নয় বাংলাদেশকে বর্জন করেছে। বুঝে না বুঝে কোনো শাসকগোষ্ঠী কোনো জনপদের প্রতি যদি বৈষম্য করে তাহলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাতারে তাদের মূল্যায়ন হবে। সমগ্র দেশকে উন্নয়ন করতে হলে দেশের বিভিন্ন জনপদের উন্নয়ন উর্বরতা, উন্নয়ন উপযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে, হিসেবে নিয়ে, বরাদ্দ ব্যাকআপ সাপোর্ট এবং ব্রেকথ্রো করত, ফরোয়ার্ড লিংকেজ এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজকে ব্যাকিং করতে হবে, যার ফলে অনুপযোগী জনপদগুলোও প্রদর্শনী শিক্ষা তথা ডেমোনস্ট্রেশন, এডুকেশন এবং উন্নয়ন ইফেক্ট দ্বারা আলোকিত হবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাব মোহাম্মদ আলী বগুড়ার, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়ার অভিজাত সন্তান। তিনিই আমাদের বর্তমান প্রিয় প্রধানমন্ত্রী। যিনি তাঁর সুবিধা, স্বাচ্ছন্দ্য, সম্পদ ইত্যাদি বিসর্জন দিয়ে অতি সাশ্রয়ী আদলে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চনাগ্রস্ত জনপদ, দলের দলাদলি সামালসহ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত ও প্রতিকূলতা সামাল দিয়ে যেভাবে ঠান্ডা মাথায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এই বিষয়গুলিতে তাঁর ভূমিকার ন্যূনতম আনুপাতিক আগ্রহ ও ত্যাগ আমাদের কি আছে? তাঁর শাসনকে কাঙ্ক্ষিত করার জন্য দল এবং জাতি হিসেবে তাঁকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে। তিন দশক পর তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে অপার সম্ভাবনাময় বগুড়ার উন্নয়নে প্রাকৃতিক আবেগপুষ্ট হয়ে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্বার্থের দ্বন্দ্বকে দূরে ফেলে বগুড়ার পক্ষে তাঁর উন্নয়ন প্রস্তাবগুলির প্রতি আমাদের সমালোচনার সীমা নাই। বগুড়ার জনপদের ইহা আত্মসমালোচনামূলক গুণবাচক বাক্যবাণ গণ্য করলে ইহাও বগুড়ার জন্য শুধু ইতিবাচকই নয় অনেক ইতিবাচক।

আরও পড়ুন

দীর্ঘ কয়েক যুগ পর একজন মাত্র প্রতিমন্ত্রী পেয়ে তার উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে বগুড়া বিভাগের পথচিত্র (রোডম্যাপ) বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ এই পাঁচ জেলার সমন্বয়ে বিভাগ গঠনের সংবাদে যারা ভ্রু উঁচু করেন, তাঁরা ইতিহাসে দৃষ্টি দিলে জানবেন বিভাগীয় জেলা রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুরের বিভিন্ন থানা নিয়ে বগুড়া জেলা গঠন হয়েছিল। সেদিন পূর্ববঙ্গের কয়েকজন ডাকসাইটে আমলা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক রংপুর সিটি কর্পোরেশনের বৃহৎ বরাদ্দের কলেবরের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছিলেন রংপুর বিভাগীয় সিটি, তাই তার সঙ্গে বগুড়াকে তুলনা করা যায় না। যে বিভাগগুলোর অংশ বিশেষের জনপদ এককালে বৃহত্তর বগুড়া জেলার সীমানাভুক্ত ছিল, সেই বগুড়াকে বিভাগ ঘোষণা করে বগুড়া বিকাশের জন্য সরকারিভাবে রেলপথ, আকাশপথ, শিক্ষা, শিল্প সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, সেবা ও বিনোদন খাতকে বুলন্দ করে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বিকাশের জন্যই বগুড়ার গুরুত্ব অপরিহার্য।

লেখক : অশোকা ফেলো, পিএইচএফ অ্যান্ড একেএস , চেয়ারম্যান টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, রফাতুল্লাহ্ কমিউনিটি ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস।

 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ার বচন

১

ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না, শিগগিরই কিছু ঘটবে : ট্রাম্প

২

জামায়াতের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সম্পর্ক আছে: রিজভী

৩

নিয়ম ভেঙে দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ অজি পেসার শুট

৪

সাজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি

৫

মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

৬