দেশের প্রথম সোনালি মুরগির জন্মস্থান জামালগঞ্জ সরকারি খামারের বেহাল দশা
জয়পুরহাট প্রতিনিধি: দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘সোনালি’ জাতের মুরগির প্রথম উদ্ভাবন হয়েছিল জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারে। একসময় যা ছিল সারাদেশের খামারিদের পথপ্রদর্শক, সেই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি আজ জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও তীব্র জনবল সংকটে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে।
ক্রমাগত লোকসান ও চরম অব্যবস্থাপনায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে সরকারি এই খামারটি। অবকাঠামো সংস্কার ও দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করার আকুল দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
খামার সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৭ সালে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে প্রায় ৩২ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে সেখানে একটি আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন করা হয়। ২০০০ সালে এই খামারেই প্রথম সোনালি জাতের মুরগির উদ্ভাবন ঘটে, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।
এই খামারকে কেন্দ্র করেই জয়পুরহাটসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলে হাজার হাজার বাণিজ্যিকভাবে মুরগির খামার গড়ে ওঠে। কেবল জয়পুরহাটেই জন্ম নেয় প্রায় ১০ হাজার ছোট-বড় খামার। বর্তমানে এই জেলার উৎপাদিত সোনালি মুরগি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হয় সারাদেশে এবং সোনালি মুরগিকে জয়পুরহাট জেলার ‘ব্র্যান্ডিং’ হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
একসময় এই খামারের উৎপাদিত ডিম ও বাচ্চা সরবরাহ করা হতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে কালের বিবর্তনে ও অবহেলায় হারিয়ে গেছে খামারটির সুদিন। খামারের মোট ১২টি সেডের মধ্যে ৪টি সেড দীর্ঘ এক যুগ ধরে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। বাকি ৮টি সেডও রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। সামান্য বৃষ্টিতেই জং ধরা টিনের ফুটো দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ে, ফলে খামারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নানা রোগবালাই। খসে পড়ছে খাদ্যগুদামের ছাদের পলেস্তারাও।
অবকাঠামোর পাশাপাশি রয়েছে চরম জনবল সংকট। ২০ জন কর্মচারীর জায়গায় বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৭ জন। এতে দৈনন্দিন কাজ পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন কর্মচারীরা, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে উৎপাদনে। বর্তমানে খামারটিতে ৩ হাজার ৬০০ মুরগি ও ১ হাজার বাচ্চা রয়েছে।
আরও পড়ুনহ্যাচারিতে বার্ষিক বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ হলেও অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের কারণে বেড়েই চলেছে লোকসানের বোঝা। বর্তমানে প্রতিটি বাচ্চার উৎপাদন খরচ ২২ টাকা হলেও তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫ টাকায়। একইভাবে প্রতি কেজি মুরগির উৎপাদন খরচ ২০০ টাকার বেশি হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ১৫০ টাকায়।
খামারের কর্মচারী দুলাল পাহান বলেন, “আগে আমরা ২০ জনের মতো স্টাফ কাজ করতাম। কমতে কমতে এখন মাত্র ৭ জনে ঠেকেছে। খামারটি এখন ভাঙা বাড়ির মতো। প্রতিটি সেডের টিন ফুটো, বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে মুরগির রোগবালাই হয়। খাদ্যগুদামের ছাদ খসে পড়ছে, আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।”
খামারের প্রধান কর্মকর্তা ও উপ-পরিচালক ডা. মো. ওয়ালী-উল-ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানে ২০টি পদের মধ্যে ১৩টিই শূন্য। এত কম জনবল নিয়ে খামার সামলানো অত্যন্ত কঠিন। পাশাপাশি ১২টি সেডের মধ্যে ৪টি পরিত্যক্ত থাকায় আমরা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছি না।
অবকাঠামো সংস্কার ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে আবারও আগের মতো উৎপাদন সম্ভব। বিষয়টি সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।” সহজ ও টেকসই সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত সচল করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারি ও সচেতন মহল।
মন্তব্য করুন








