ভিডিও শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:২৪ এএম

আনিকা আনজুম লুবনা

কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ: সুযোগ বাড়লেও কমেনি চ্যালেঞ্জ

কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ: সুযোগ বাড়লেও কমেনি চ্যালেঞ্জ

সমাজে নারীদের পরিবার, সংসার, ক্যারিয়ার সবকিছু নিয়ে জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যেতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তাকে প্রতিনিয়ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে জীবন পরিচালিত করতে হয়। দৈনন্দিন জীবনে নানা বাধা বিপত্তি এবং সমাজের কটুক্তি এড়িয়ে নারীরা প্রতিদিন নিজেদের যোগ্য করে তুলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। 

প্রতিদিনই তাকে পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে নানা বঞ্চনার শিকার হতে হয়। গত কয়েক বছরে নারী শিক্ষা, উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারী শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যায়ে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়াও উচ্চ শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ ৯৬.১% নিশ্চিত হয়েছে।

 পূর্বে নারীদের কর্মক্ষেত্রে সীমা নির্ধারিত থাকলেও এখন প্রত্যেক সেক্টরে নারীদের সু-উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। দেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে এ মধ্যে, বিশেষ করে পোশাক শিল্পের মূল কারিগর নারী। এটি নারী কর্মক্ষেত্র বাড়ার একটি অন্যতম সেক্টর। রেমিটেন্স অর্জনের লক্ষ্যে দেশের দক্ষ-অর্ধদক্ষ নারী কর্মী বিদেশে পাঠানোর সুব্যবস্থা করেছে সরকার।কিন্তু হতাশাজনক বিষয় এই যে সুযোগ বাড়লেও নারীদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সামাজিক, পারিবারিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবার, আত্মীয়-স্বজনরাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত একজন নারীর বিয়ের পরে তার সংসার, কাজকর্ম তথা বান্নাবান্না, বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা করা, সন্তান জন্মদানের পর শিশু শিশু স সন্তান লালন-পালন, এসব দায়িত্ব শুধু নারীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। 

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সন্তান জন্মদানের পর প্রায় ৭৩ শতাংশ নারী কর্মজীবন থেকে ঝরে পড়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানুষ মনে করে, নারীরা যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে অক্ষম। বর্তমান যুগে এসেও উচ্চ পদে নেতৃত্ব দানকারী নারীর সংখ্যা হতাশাজনকভাবে কম যা বিশ্বব্যাপী মাত্র ৩১%। পারিবারিক কাজের চাপে তারা কর্মক্ষেত্রে সময় দিতে পারে না। ওখঙ এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, একই কাজ করার পরেও পুরুষের তুলনায় নারীর আয় ২২ থেকে ২৫% কম। বিশেষত পোশাক ও কৃষিশিল্পে এই বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করে আছে।

নারীদের কর্মক্ষেত্রে ছোট করা, অপমান, মানসিক অত্যাচার, ইভটিজিং, ধর্ষণের মত নৃশংসতা নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাস, ট্রেন, অটো রিক্সায় যৌন হয়রানির শিকার হওয়া বা নিরাপত্তার অভাবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক পরিবার নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাকরি করার অনুমতি প্রদান করে না। 

আরও পড়ুন

প্রায় ৫৪% নারী সন্তান জন্ম দানের পর তার শিশু সন্তানের দেখভালের জন্য ভালো ডে কেয়ার সুবিধার অভাবে তারা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এসব নির্মম ও কঠোর বাস্তবতার কারণে নারীরা প্রায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। সংসার সন্তান সামলানোর দায়িত্ব শুধু নারীর একার না, নারী-পুরুষ সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সুন্দর পরিবার গঠন করা সম্ভব। বিশ্বের প্রেক্ষাপটেও একই চিত্র দেখা যায়। 

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে কম। আইসল্যান্ড, নরওয়ে এবং সুইডেনে পিতৃত্বকালীন ছুটি, সমান মজুরি আইন এবং রাষ্ট্রীয় ডে কেয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে। রুয়ান্ডায় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৬১ শতাংশের বেশি। যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে নীতি সহায়তা পেলে নারীরা নেতৃত্বে আসতে পারে। এমতাবস্থায় নারীদের প্রতি সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টি প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে নারীদের প্রতি এই বৈষম্য চিরতরে নিপাত করা সম্ভব।

প্রথমত, গর্ভাবস্থায় সবেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সন্তান জন্মদানের কারণে কোনো নারীকে চাকরি হারানোর ভয়ে ভুগতে না হয়।ও বেসরকারি ডে-কেয়ার সর্বাবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোরভাবে পরিচালিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে কিছু সংখ্যক নারী ঘরের বাইরে বের না হয়েও ঘরে বসেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। চতুর্থত, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেন কোনো নারীকে ঘরের বাইরে বের হয়ে হেনস্তার শিকার হতে না হয়। তাছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরে নারী কোটা বৃদ্ধি করতে হবে। সবচেয়ে বড় দরকার মানসিকতার পরিবর্তন করা। শুধু সুযোগ সুবিধা বাড়ালেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একজন নারী কেবল কারো কন্যা, স্ত্রী, মা হয়ে অন্যের উপর নির্ভর হয়ে জীবন পরিচালিত করবে মন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ স্যানিটেশন বা টয়লেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শারীরিক স্বাস্থ্যের সাথে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। পারিবারিক কাজের জন্য পুরুষদের সহায়তা মানসিকতার পরিবর্তন একান্ত ভাবে কাম্য।

নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহ প্রদান করতে হবে এবং সমানভাবে নারী পুরুষ মিলে গৃহস্থালী কাজ সুসম্পন্ন করতে হবে। এসব বিষয়ে নারীদের অবমাননা করা হলে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। এতে শুধু নারী অধিকারই রক্ষা পাবে না বরং তার সাথে আমাদের বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। অর্থনীতির চাকা সচল হবে। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের পদাঙ্গনে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন সাধন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ: সুযোগ বাড়লেও কমেনি চ্যালেঞ্জ

১

রাজধানীতে ডিএমপির নিয়মিত অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫২৩

২

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ

৩

আজ শুভ মহালয়া

৪

রিভার প্লেট জাদুঘরে স্থান পেল মেসির বিদায়ী ম্যাচের জার্সি

৫

বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি: ২৩ হাজার পুলিশ মোতায়েন, বন্ধ ৪৫টি মেট্রো স্টেশন

৬