বগুড়ায় পলিথিন ব্যাগের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার : সামন্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, কমছে জমির উর্বরতা
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ায় নিষিদ্ধ পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও যত্রতত্র ফেলার কারণে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়। হাট-বাজার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার দোকানে সবখানেই দেদারসে ব্যবহৃত হচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগ।
ব্যবহারের পর এসব পলিথিন সরাসরি গিয়ে পড়ছে শহরের ড্রেন, নালা-নর্দমা এবং কৃষিজমিতে। ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, আর কৃষিজমিতে আটকে থাকা পলিথিনের কারণে মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে মাটির উর্বরতা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া মহানগর এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন কঠিন বর্জ্য বা আবর্জনা উৎপাদিত হয়। এই উৎপাদিত মোট বর্জ্যের একটি বিশাল অংশজুড়ে থাকে নিষিদ্ধ পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক বলে বিবেচনা করে ২০০২ সালে তৎকালিন বিএনপি সরকারের আমলে রফতানিমুখী শিল্প ছাড়া সব ধরনের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। প্রাণ ও পরিবেশ বাঁচাতে শাস্তির বিধান রেখে আইন করা হয়। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সারাদেশে চলছে পলিথিনের রমরমা বাণিজ্য।
২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বতী সরকারের সময় কিছুটা কড়াকড়ি আনা হলেও একপর্যায়ে তা ঝিমিয়ে পড়ে। বগুড়ার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজার, চাষীবাজার এবং কলোনি বাজার ঘুরে দেখা যায়, শাকসবজি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে চাল-ডাল বিক্রিতেও ব্যাপকভাবে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্রেতারা পাটের বা চটের ব্যাগ সাথে না আনায় বিকল্প হিসেবে পলিথিন দিতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।
নগরের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনগুলোতে দেখা যায়, আবর্জনার ৮০ শতাংশই পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। পলিথিন অপচনশীল হওয়ায় তা বছরের পর বছর ড্রেনের তলদেশে জমে পানি নিষ্কাশনের গতি পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে। এজন্য সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা ও নোংরা পানি উপচে পড়ছে প্রধান প্রধান সড়কে, যা দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুনঅন্যদিকে, বগুড়ার ফসলি জমিতে প্রতিনিয়ত মিশছে শহরের উচ্ছেদকৃত বর্জ্য। মাটির নিচে পলিথিন জমা থাকায় মূল মাটির সাথে বাতাস ও পানির প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মাটির নাইট্রোজেন ও অনুজীবের কার্যকারিতা কমে গিয়ে উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং স্বাভাবিক কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এই অনিয়ন্ত্রিত পলিথিন ব্যবহার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বগুড়ার পরিবেশ ও কৃষি উভয়ই এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
এব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহথীর বিন মোহাম্মদ জানান, বগুড়ায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বগুড়ার রাজাবাজারে অভিযান পরিচালনা করে ৩৩০ কেজি পলিথিন জব্দ করাসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়াও জন সচেতনতা রোধে নিয়মিত লিফলেট বিতরণ ও তথ্য অফিসের মাধ্যমে মাংকিং করা হচ্ছে।
এব্যাপারে বগুড়ার বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামাল সম্প্রতি শহরের সাতমাথা, রাজাবাজার, জলেশ্বরীতলা, চকযাদু রোড, দত্তবাড়ি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন পরিস্কার কাজের উদ্বোধনের সময় জানান, ড্রেনগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, আবর্জনার ৮০ শতাংশই পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য।
পলিথিন অপচনশীল হওয়ায় তা বছরের পর বছর ড্রেনের তলদেশে জমে পানি নিষ্কাশনের গতি পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে। এজন্য সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা ও নোংরা পানি উপচে পড়ছে প্রধান প্রধান সড়কে, যা জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ।
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, কৃষিজমিতে আটকে থাকা পলিথিনের কারণে মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। মাটির নিচে পলিথিন জমে মাটির সাথে বাতাস ও পানির প্রবাহ ব্যাহত হয়। এতে মাটির নাইট্রোজেন ও অনুজীবের কার্যকারিতা কমে গিয়ে উর্বরতা নষ্ট হয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন







