ছেঁড়া ও ময়লা নোটের বিড়ম্বনা: সাধারণ মানুষের নীরব ভোগান্তি
সুরাইয়া বিনতে হাসান : সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে বের হওয়া একজন রিকশাচালক, বাসে ওঠার সময় ভাড়া দিতে গিয়ে বিব্রত হওয়া সাধারণ চাকুরিজীবী, কিংবা ফুটপাতের এক কাপ চা বা এক হালি ডিম কেনার পর দোকানির মুখে শোনা, 'ভাই, এই নোট পাল্টে অন্যটা দিন' এমন দৃশ্য আজ আমাদের শহুরে ও গ্রামীণ জীবনের এক অত্যন্ত পরিচিত ও বিরক্তিকর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বাজারে লেনদেনের সময় খুচরা টাকার ছেঁড়া, ফাটা, স্কচটেপ মারা কিংবা অতিরিক্ত ময়লা নোট নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অনীহা ও অস্বীকৃতি এখন এক নিত্যদিনের বিড়ম্বনা। সমাজের নিচুতলার মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতারা প্রতিনিয়ত যে নীরব মানসিক ও আর্থিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তার গভীরে রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত জটিলতা, যা নিয়ে জোরালো আলোচনার সময় এখনই।
আমাদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক লেনদেনের মূল ভিত্তি হলো নগদ টাকা বা ক্যাশ কারেন্সি। ডিজিটাল লেনদেনের বিপ্লব যতই সাধিত হোক না কেন, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো সরাসরি খুচরা কাগজি নোটের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, গণপরিবহন, রিকশাভাড়া কিংবা ছোটখাটো খুচরা ব্যবসার ক্ষেত্রে ৫, ১০, ২০, ৫০ বা ১০০ টাকার নোটের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজারে চলাচলকারী এসব ছোট নোটের একটি বড় অংশই আজ জীর্ণ, মলিন এবং ব্যবহার অনুপযোগী।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হন সমাজের প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষ। একজন রিকশাচালক যখন সারা দিন বিকশা চালিয়ে গোধূলি লগ্নে, যাত্রীর কাছ থেকে একটি দশ বা বিশ টাকার ছেঁড়া নোট পান, তখন থেকেই শুরু হয় তার আসল যুদ্ধ। সন্ধ্যায় সেই রিকশাচালক যখন মুদি দোকান থেকে চাল বা তেল কিনতে যান, দোকানি সেই নোট নিতে অস্বীকার করেন। শুধু তা-ই নয়, অনেক সময় বাসের কন্ডাক্টর বা হকাররাও এই নোট গ্রহণ করতে চান না। দিনের পর দিন ঘুরেও যখন ওই মেহনতি মানুষটি নোটটি বদলাতে পারেন না, তখন অনেক সময় বাধ্য হয়ে সেই নষ্ট নোটটি অবমূল্যায়িত করে বা কম দামে অন্যের কাছে গছিয়ে দিতে বাধ্য হন।
এটি প্রকারান্তরে দরিদ্র মানুষের পকেট থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ কেড়ে নেওয়ার শামিল। অন্যদিকে, খুচরা ব্যবসায়ীদের অবস্থাও কম শোচনীয় নয়। তারা চাইলেই ক্রেতার কাছ থেকে ছেঁড়া নোট ফেরৎ দিতে পারেন না, কারণ তারা নিজেরাও পাইকারি বাজারে গিয়ে ওই নোট চালিয়ে উঠতে পারেন না। এব ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই বাকবিতন্ডা, হাতাহাতি এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সমাজের একটি সাধারণ আদান-প্রদান যেখানে সহজ ও সাবলীল হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা এক প্রকার আস্থার সংকটে রূপ নিয়েছে। এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এক ধরনের উদাসীনতা ও গড়িমসি দায়ী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো নাগরিক বা গ্রাহক দেশের যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে গিয়ে তাদের ছেঁড়া, ফাটা বা ময়লা নোট পরিবর্তন করে সমমূল্যের নতুন বা সচল নোট গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সাধারণ মানুষ যখন ব্যাংকের কাউন্টারে ছেঁড়া নোট নিয়ে যান, তখন ব্যাংক কর্মকর্তাদের অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা, বিরূপ আচরণ এবং নানামুখী জটিলতার মুখে পড়তে হয়। অনেক ব্যাংক নানা অজুহাতে নোট পরিবর্তন করতে চায় না কিংবা সাধারণ গ্রাহকদের ফিবিয়ে দেয়। কোথাও কোথাও আবার ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখা বা নির্দিষ্ট দিনের অজুহাত দেখিয়ে মানুষকে হয়রান করা হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি সহজ শর্তে ও আন্তবিকতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের এই নোট বদলানোর কাজটি করে দিত, তবে বাজারে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হতো না।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এব পেছনে লুকিয়ে থাকে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরির মানসিকতাও। অনেক সময় বাজারে নতুন নোটের পর্যাপ্ত সরববাহ থাকে না বা তা বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গুদামজাত বা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। এর ফলে বাজারে সচল নোটের আকাল দেখা দেয় এবং বাধ্য হয়েই মানুষ পুরোনো ও ছেঁড়া নোটগুলো দীর্ঘসময় ধরে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। কাগজি নোটের মান এবং স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য যে ধরনের টেকসই পলিমার বা উন্নত কাগজ ব্যবহার করা উচিত, তার ঘাটতিও দীর্ঘদিনের। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি বাড়াতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই যেকোনো ব্যাংক শাখা থেকে ছেঁড়া ও ময়লা নোট সহজে পরিবর্তন করতে পারে।
আরও পড়ুনব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে আরও জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজাবে নতুন ছোট নোটের নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পুরোনো ও নোংবা নোটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাজার থেকে তুলে নেওয়া সম্ভব হয়। তৃতীয়ত, দেশের সব ব্যাংকে নোট বিনিময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সহজপ্রবেশ্য আলাদা হেল্প ডেস্ক বা কাউন্টার চালু করা যেতে পারে, যেখানে সাধারণ মানুষ কোনো রকম ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই সেবা পাবে। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে কাগজি নোটের পাশাপাশি উন্নত মানের টেকসই উপাদান দিয়ে মুদ্রা প্রস্তুতের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
টাকার নোট কেবল বিনিময়ের একটি মাধ্যম নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলারও প্রতীক। একটি ছোট ছেঁড়া নোটের কারণে যখন সাধারণ মানুষের সম্মানহানি ঘটে এবং তারা প্রতিদিনের জীবনযাপনে বাড়তি মানসিক চাপের মুখে পড়েন, তখন তা একটি সুশৃঙ্খল সমাজের জন্য শুভ লক্ষণ হতে পারে না। সাধারণ মানুষের এই নীরব ভোগান্তির অবসান ঘটাতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই মুদ্রাবাজারের বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব। মেহনতি মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ ও স্বস্তিদায়ক করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের জোরালো দাবি।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








