বিজ্ঞানহীন চার দশক
বগুড়ার উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কলেজগুলো হারাচ্ছে শিক্ষার্থী
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ার পাঁচটি বেসরকারি কলেজকে তিন যুগেরও বেশি সময় আগে সরকারি করা হলেও শহরের একটি বাদে উপজেলা পর্যায়ের চারটি কলেজে নতুন করে শিক্ষকের কোন পদই সৃষ্টি করা হয়নি। অর্থাৎ চারটি কলেজ চলছে বেসরকারি আমলের স্বল্প শিক্ষক দিয়ে। এমনকি একটি বাদে বাকি তিনটি কলেজে এখনো খোলা হয়নি অনার্সের কোর্স। বিএ (পাশ) কোর্স খোলা হলেও কোনো কলেজেই বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সরকারি ওই কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী কমছে।
‘শাহ্ সুলতান’ এবং ‘নাজির আখতার’ নামে বগুড়ার দুই কলেজ ১৯৮৪ সালের পহেলা নভেম্বর সরকারি করা হয়। তখন শহরের বনানী এলাকার শাহ্ সুলতান কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে মোট ১৬টি বিষয়ে পড়ানো হতো। শিক্ষকের পদ ছিল ৩৭ টি। অন্যদিকে জেলার সোনাতলা উপজেলা সদরে অবস্থিত নাজির আখতার কলেজে শিক্ষকের পদ ছিল ৩৩টি। আর উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতকে পড়ানো হতো ১৪টি বিষয়ে। তবে পরবর্তীতে তিন দফায় শাহ্ সুলতান কলেজে নতুন করে শিক্ষকের আরও ২৭টি পদ বাড়িয়ে মোট ৬৪টি পদ সৃষ্টি করা হয়। ১৪টি বিষয়ে অনার্স কোর্সও চালু করা হয়। কিন্তু একই সময়ে অর্থাৎ ৪২ বছর আগে সরকারি করা হলেও উপজেলা পর্যায়ের সোনাতলার নাজির আখতার কলেজে নতুন করে শিক্ষকের একটি পদও সৃষ্টি করা হয়নি। বরং সেখানে উপাধ্যক্ষসহ শিক্ষকের মোট ১০টি বা ৩০ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। ফলে ওই কলেজের শিক্ষকদের পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শুধু শিক্ষক সংকটই নয় বিজ্ঞানের উৎকর্ষের এই সময়ে নাজির আখতার কলেজটি সরকারিকরণের পর গত চার দশকে স্নাতক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখার ন্যুনতম কোন সুযোগও সৃষ্টি করা হয়নি। এমনকি অভিভভাবকদের চাপে কলা ও বাণিজ্য অনুষদের ৬টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাবে খন্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। এতে কলেজটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পেতে শুরু করেছে। দেড় দশকের ব্যবধানে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী কমেছে। ওই কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মঞ্জুর কাদির জানান, অত্যন্ত দিনহীনভাবে চলছে কলেজটি। অধ্যক্ষসহ শিক্ষকের ৩৩টি পদের মধ্যে ১০টি বা ৩০ শতাংশ শূন্য। ২০১২-২০১৩ শিক্ষা বর্ষে ওই কলেজে ৬টি বিষয়ে কোন শিক্ষকের পদ সৃষ্টি ছাড়াই যথাক্রমে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, হিসাব বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা এবং ইসলামের ইতিহাস-এ অনার্স কোর্স চালু করা হয়। এনাম কমিশন অনুযায়ী কোনো কলেজে অনর্সের কোর্স চালু করা হলে প্রতিটি বিষয়ের জন্য ১২জন করে শিক্ষক থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু এই কলেজে সেটি করা হয়নি।
সোনাতলার ওই কলেজের মতই বেহাল অবস্থা বগুড়ার সান্তাহার, তালোড়া এবং গাবতলীতে অবস্থিত অপর তিনটি সরকারি কলেজেরও। তিনটি কলেজের মধ্যে তালোড়া সরকারি শাহ এয়তেবাড়িয়া কলেজটি সরকারি করণের ৩৮ বছর পরেও উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়নি। আর গাবতলী সরকারি কলেজে স্নাতকে কলা বিভাগের শুধু সামাজিক বিজ্ঞান ছাড়া বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখার কোন সুযোগই রাখা হয়নি। ফলে ওই কলেজ তিনটিতেও শিক্ষার্থী কমছে অস্বাভাবিকভাবে।
আরও পড়ুনবগুড়ার গাবতলী কলেজ ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালে সরকারি করা হয়। কলেজটিতে ১৪টি বিষয়ে পড়ানো হয়। তবে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের কোন পদই সৃষ্টি করা হয়নি। সহকারি অধ্যাপকের মাত্র ৩টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। আর প্রভাষকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে ১৮টি। তার মধ্যে মাত্র ৫জন কর্মরত। ওই কলেজে সহকারি অধ্যাপক ও প্রভাষকের ২১টি পদের মধ্যে ১০টিই শূন্য।
গাবতলী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এসএম কবীর রানা জানান, সরকারিকরনের পর প্রায় ৩৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ওই কলেজে অনার্স কোর্স চালু করা যায়নি। স্নাতকে শুধু ব্যালেচর অব সোস্যাল সায়েন্স বা বিএসএস চালু রয়েছে। কিন্তু ব্যালেচর অব আর্টস বা বিএ ও ব্যাচেলর অব সায়েন্স বা বিএসসি নেই। কলেজটিতে যে ১৪টি বিষয় রয়েছে তার মধ্যে অর্থনীতি, ইংরেজি, পদার্থ বিদ্যা, ব্যবস্থাপনা এবং হিসাববিজ্ঞানসহ ৯টি বিষয়ে কোন শিক্ষকই নেই। বর্তমানে ওই কলেজে ১ হাজার ৮৭৮জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিকে ১হাজার ৫১৯জন এবং বাকি ৩৫৯জন বিএসএস-এ অধ্যয়ন করছেন।
দুপচাঁচিয়ার তালোড়ায় অবস্থিত শাহ এয়তেবাড়িয়া কলেজটি ১৯৭০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি ১৯৮৮ সালের ৩১ মার্চ সরকারি করা হয়। ৩৮বছর পরেও ওই কলেজটি স্নাতকে উন্নীত করা হয়নি। বর্তমানে সেখানে ২০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নিয়মিত ক্লাস করেন না বলে জানা গেছে।
অপরদিকে আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে অবস্থিত সান্তাহার কলেজটি ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। কলেজটি ১৯৮৮ সালের ৩১ মার্চ সরকারি করা হয়। সেখানে অধ্যক্ষসহ শিক্ষকের ৩৫টি পদের মধ্যে ৭টি শূন্য রয়েছে। এক সময়ে ওই কলেজটি পশ্চিম বগুড়ার উচ্চ শিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে কলেজটিতে অনেক চেষ্টা করেও অনার্স কোর্স চালু করা যায়নি। ফলে শিক্ষার্থী ভর্তি কমেছে। আগে এই কলেজে শুধু স্নাতকেই প্রায় দেড় হাজারের মত শিক্ষার্থী ভর্তি হতেন । বর্তমানে ভর্তি হচ্ছেন মাত্র ২০০জন শিক্ষার্থী। ওই কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুল ওহাব জানান, এই কলেজে অনার্স কোর্স চালু হয় খুব জরুরী। এখানে অনার্স খুললে পশ্চিম বগুড়াসহ নওগাঁ জেলার শিক্ষার্থীরাও বাড়িতে থেকে এখানে পড়ালেখা করার সুযোগ পাবেন।
মন্তব্য করুন



_medium_1783955692.jpg)

_medium_1783954896.jpg)
_medium_1783954709.jpg)


