ধুনটে সুপারিতে সুদিনের স্বপ্ন বুনছেন যমুনার বাঁধে আশ্রিত বাস্তুহারা নারীরা
রফিকুল আলম, ধুনট (বগুড়া) থেকে : বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রিত পরিবারে নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন সুপারিশিল্পকে ঘিরে। পানের খিলির উপযোগী করে সুপারি কাটার কাজ করে সংসারে বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন তারা। যমুনা নদীর ভাঙনে বাস্তুহারা পরিবারের মানুষগুলো এখন সুপারিতে সুদিনের স্বপ্ন দেখছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যমুনা পাড়ের মানুষের এক সময় সব ছিল। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, ফসলি জমি। কিন্ত যমুনার ভাঙনে সব কিছু হারিয়ে আজ তারা বাস্তুহারা।
এলাকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের পুরুষেরা হয়ে পড়েন কর্মহীন। অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া। পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন কাটে অতিকষ্টে। হাজারো সমস্যা-সংকটের মাঝে ১০-১২ বছর আগে সুপারি কেটে টুকরো করার কাজ শুরু করেন রঘুনাথপুর গ্রামের নারীরা। এ কাজে তারা অভাব-অনটন কাটিয়ে সচ্ছলতা এনে সংসারের হাল ধরেছেন।
নারীদের এ কাজের সুযোগ করে দেন যমুনার বাঁধে আশ্রিত রঘুনাথপুর গ্রামের আব্দুল খালেক ও ফজলুল হক। খুলনা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সুপারি কিনে এনে পানের খিলির উপযোগী করে টুকরো করার জন্য সরবরাহ করেন তারা। প্রতি কেজি সুপারি টুকরো করার জন্য নারীদের পারিশ্রমিক দেন ৫টাকা। একেক জন নারী গৃহস্থালী কাজের ফাঁকে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ কেজি সুপারি টুকরো করে ৬০-৮০ টাকা আয় করছেন। রঘুনাথপুর গ্রামের শতাধিক নারীর সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ কাজ শুরু করেন পার্শ্ববর্তী বানিয়াজান, শহড়াবাড়ি, পুকুরিয়া, ভান্ডারবাড়ি, বড়বিলা, শিমুল দাইড়, নাটুয়ারপাড়ার শত শত নারী। অভাবী পরিবারের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরাও এখন লেখাপড়ার পাশাপাশি সুপারি টুকরো করার কাজ করেন। লেখাপড়ার খরচ মিটিয়ে পারিশ্রমিকের অর্থ তুলে দেন পরিবারের কাছে।
আরও পড়ুনউপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের সুপারি ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, যমুনার ভাঙনে এলাকার মানুষ খুবই গরিব হয়ে গেছে। কাজের সন্ধানে বাড়ি ছেড়ে অনেক পুরুষ চলে গেছেন অন্যত্র। তখন আমরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সুপারি কিনে এনে পানের খিলির জন্য সুপারি টুকরো করতে গ্রামের নারীদের কাছে সরবরাহ করি। এদিকে, পুঁজির অভাবে ব্যবসা ঠিকমতো চালাতে পারছেন না, এমন হতাশা প্রকাশ পায় আব্দুল খালেকের কথায়, স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া গেলে ব্যবসার প্রসারের পাশাপাশি এলাকার নারীরা বাড়িতে বসেই বাড়তি আয় করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন বলে জানান তিনি।
যমুনা পাড়ের রঘুনাথপুর গ্রামের তানিয়া খাতুন জানান, অভাব অনটনের কারণে ৫ বছর আগে সংসার চালাতে পারছিলেন না তিনি। তখন সুপারি কাটার কাজ শুরু করেন। প্রতিদিন সুপারি টুকরো করে ৮০ টাকা পান। মাসে আয় হয় প্রায় আড়াই হাজার টাকা। এই টাকা থেকে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ মিটিয়ে অবশিষ্ট টাকা সংসারে খচর করেন।
যমুনা পাড়ের ভান্ডারবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী সুমি খাতুন জানায়, লেখাপড়ার পাশাপাশি সুপারি কেটে টুকরো করে পারিশ্রমিকের অর্থ তুলে দেন মায়ের হাতে।
একই ভাবে রঘুনাথপুর গ্রামের বুলবুলি খাতুন, শাহার বানু, মর্জিনা খাতুন ও মালা খাতুনসহ অনেকে জানান, সুপারি টুকরো করে প্রতি মাসে দুই-আড়াই হাজার টাকা আয় করেন। তারা আরো জানান, সুপারি কাটার কাজের চেয়ে পারিশ্রমিক খুবই কম দেন ব্যবসায়ীরা। ধুনট উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাহিদা সুলতানা বলেন, যমুনা নদীর ভাঙনে এলাকার মানুষ অর্থহীন হলেও সুপারিশিল্পে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। সুপারিশিল্পের সঙ্গে জড়িতদের ঋণের ব্যবস্থা করবেন বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








