কৃষকের ঘামে গড়া ফসলের ন্যায্যমূল্য কোথায়
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি কৃষি। প্রখর রোদ, অঝোর বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে যে কৃষকেরা আমাদের অন্নের জোগান নিশ্চিত করেন, আজ তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার। বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করেও তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য। কৃষকের ঘামে গড়া ফসলের প্রকৃত লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটের হাতে, যা দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। একজন কৃষক সারাবছর কঠোর পরিশ্রম করেন শুধুমাত্র একটি আশায় ফসল বিক্রি করে পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ফসল ঘরে তোলার পর যখন তিনি উৎপাদন খরচের তুলনায় সামান্য মূল্য পান, তখন তার জীবনে নেমে আসে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। সংসারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও হয়ে পড়ে কঠিন। দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনা বহু কৃষক পরিবারকে আর্থিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে। ঋণের বোঝা, লোকসান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ অনেক কৃষককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটভিত্তিক ব্যবসায়ীদের প্রভাব। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ফসল কিনে শহরের বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হলেও সেই অতিরিক্ত লাভের সামান্য অংশও কৃষকের হাতে পৌঁছায় না। বরং এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও ফড়িয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করে। ফলে উৎপাদক সবচেয়ে কম লাভ পায়, অথচ ভোক্তাকে গুনতে হয় বেশি দাম। বাজারসংক্রান্ত তথ্যের অভাবও কৃষকদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক কৃষক বিভিন্ন বাজারের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য পান না। এই সুযোগে স্থানীয় দালাল ও ফড়িয়ারা কম দামে ফসল কিনে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষক সরাসরি বাজারদর সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।
প্রতিবছর বাম্পার ফলনের মৌসুমে কৃষকদের আরেকটি বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য পচনশীল পণ্যের উৎপাদন বেড়ে গেলে বাজারে দাম হঠাৎ কমে যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত হিমাগার ও সংরক্ষণাগারের অভাবে কৃষকেরা ফসল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে পারেন না। ফলে উৎপাদন খরচ না উঠলেও বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের চোখের সামনে তার পরিশ্রমের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ক্রমাগত লোকসানের কারণে কৃষকেরা কৃষিকাজে আগ্রহ হারাবেন, নতুন প্রজন্ম কৃষি পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং দেশের খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সাফল্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রথমত, কৃষিপণ্যের জন্য বাস্তবসম্মত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রতিদিনের বাজারদর সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত হিমাগার ও সংরক্ষণাগার নির্মাণের মাধ্যমে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
সর্বোপরি, কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র সমাজের দায়বদ্ধতা। সরকার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, নিরাপদ থাকবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
আরও পড়ুনলেখক :
আবুল হোসাইন কুরাইশী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক





(1)_medium_1781433720.jpg)


