প্রিজনভ্যান থেকে সেল কোনো প্রতিকূলতাই আটকাতে পারেনি সাংসদ রনিকে
পুলিশের হয়রানি এড়াতে এক শীতের রাতে জনশূন্য বিলের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কম্বল দিয়ে গা-মাথা মুড়িয়ে আমি বিলের ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ অনুভব করলাম পাশে নরম লোমশ কী যেন একটা নড়াচড়া করছে। মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে দেখি আমার গা ঘেঁষে একটি বুনো শিয়াল শুয়ে আছে।
স্মৃতি সঞ্চায়িতা অর্থিঃ জেল, নির্যাতন, রাজনৈতিক দুঃসময় আর মায়ের মৃত্যু সব মিলিয়ে এক লড়াকু ও সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি। রাজনৈতিক জীবনের কঠিন বাস্তবতা আর ব্যক্তিগত ত্যাগের নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে সম্প্রতি তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন ‘দৈনিক করতোয়া’র। তার সেই একান্ত সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
দৈনিক করতোয়া: আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের গল্পটা জানতে চাই।
সুরাইয়া জেরিন রনি: আমার রাজনীতির অনুপ্রেরণা খুঁজতে একদম কৈশোরে ফিরে যেতে হবে, সম্ভবত ১৯৯১ সালের দিকে। তখন থেকেই আমি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হৃদয়ে লালন করতাম। মূলত ওনাকে ভালোবেসে এবং ওনার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই আমার রাজনীতিতে পদার্পণ। এরপর কলেজে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতিতে একটু একটু করে সক্রিয় হওয়া। কলেজ জীবনের পর বিয়ের সময় এবং মা হওয়ার পর রাজনীতিতে কিছুটা বিরতি ছিল। তবে ওয়ান-ইলেভেনের (১/১১) পর থেকে আমি আবার পুরোদমে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসি।
দৈনিক করতোয়া: ফেসবুকে আপনার একটি ভিডিও খুব ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে আপনাকে প্রিজনভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার সময় বলতে দেখা গেছে, ‘আমার বাচ্চার পরীক্ষা আছে’। সেইদিন আসলে কী ঘটেছিল?
সুরাইয়া জেরিন রনি: সেদিন আমরা রাজশাহী সমাবেশ শেষ করে ঢাকায় গিয়েছিলাম। তখন দেশে তীব্র রাজনৈতিক দমনপীড়ন চলছিল। আমাদের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভাই আমাদের বললেন, ‘মেয়েরা তোমরা পার্টি অফিসের ভেতরে যাও’। বাইরে তখন একটু পরপরই পুলিশ টিয়ারশেল ও গুলি ছুড়ছিল। একপর্যায়ে পুলিশ তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে আমাদের বের করে নিয়ে আসে এবং আমার সন্তানসহ আমাকে গ্রেফতার করে। পরের দিনই ছিল ওর অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষা। একজন মা হিসেবে তখন আমি দিশেহারা হয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে আকুতি জানাচ্ছিলাম, যেন আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
দৈনিক করতোয়া: আপনার এই দীর্ঘ ও কঠিন রাজনৈতিক যাত্রায় পারিবারিক সহযোগিতা কেমন ছিল?
সুরাইয়া জেরিন রনি: পারিবারিকভাবে আমি সবসময় অনেক বড় সাপোর্ট পেয়েছি। পুরো পরিবার আমার পাশে ছিল। তবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখের জায়গা হলো, সেদিন প্রিজনভ্যানে সন্তানের জন্য আমার যে আকুতি ও কান্নাকাটির দৃশ্য টিভিতে ও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল, তা দেখে আমার মা স্ট্রোক করেন এবং মারা যান। আমি ঢাকা যাওয়ার সময় আমার সুস্থ মাকে রেখে গিয়েছিলাম। প্রায় তিন মাস পর জামিনে বের হই, ততক্ষণে সব শেষ। আমি বাসায় ফিরে শুধু মায়ের কবর দেখতে পেয়েছি। এটি আমার জীবনেরচেয়ে বড় শোক। একজন সন্তান হিসেবে আমার মনে সারাজীবন এই অপরাধবোধ থাকবে যে আমার কারণেই মা চলে গেলেন, আর আমি ওনার শেষ যাত্রায় পাশে থাকতে পারলাম না।
দৈনিক করতোয়া: আপনার কারাবাসের দিনগুলো কেমন ছিল? সেই দুর্বিষহ স্মৃতির কিছু মুহূর্ত যদি আমাদের সাথে শেয়ার করতেন।
আরও পড়ুনসুরাইয়া জেরিন রনি: জেলখানায় আমি চরম দুর্বিষহ দিন পার করেছি এবং আমাকে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। সেখানে এক নারী কয়েদির সঙ্গে একবার আমার সামান্য বাকবিতন্ডা হয়েছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাকে সেলে রাখা হয়। সেই অন্ধকার সেলে একদিন একটি বিষধর বিচ্ছু আমাকে আক্রমণ করে বসে। আমি ভয়ে এত জোরে চিৎকার করেছিলাম যে পুরো জেলখানার সবার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সেই আতঙ্কে আমি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ি যে কয়েকদিন আমার কোনো জ্ঞান ছিল না। পরবর্তীতে আমাকে কারা মেডিকেলেও পাঠানো হয়েছিল। শারীরিক ও মানসিক সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ কষ্টের মধ্য দিয়ে আমার জেলজীবন কেটেছে।
দৈনিক করতোয়া: রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের সময় কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনার শিকার হয়েছিলেন কি?
সুরাইয়া জেরিন রনি: আমাদের রাজনৈতিক জীবনে আসলে অনাকাঙ্খিত পজিটিভ বা ভালো কিছু পাওয়ার সুযোগ ছিল না। আমরা এক চরম দুঃসময় পার করেছি। একদিকে ছিল তৎকালীন সরকারের দলীয় সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব ও ভয়, অন্যদিকে ছিল পুলিশের হয়রানি। সেই দিনগুলোতে আমরা না ঘরে থাকতে পেরেছি, না বাইরে কোথাও নিরাপদ ছিলাম। প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে চরম উৎকণ্ঠায়।
দৈনিক করতোয়া: পুলিশের হয়রানি এড়াতে যখন রাতের পর রাত বাইরে কাটাতে হতো, সে সময়ের স্মরণীয় বা ভীতিকর কোনো ঘটনা কি মনে পড়ে?
সুরাইয়া জেরিন রনি: হ্যাঁ, এক শীতের রাতের ঘটনা কখনো ভুলব না। তখন আমরা এক জনশূন্য বিলের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। ক্লান্ত শরীর আর তীব্র মানসিক টেনশন নিয়ে কম্বল দিয়ে গা-মাথা মুড়িয়ে আমি বিলের ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়ি। গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় হঠাৎ অনুভব করলাম পাশে নরম লোমশ কী যেন একটা নড়াচড়া করছে। কৌতূহলবশত মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার আত্মা শুকিয়ে গেল! দেখি আমার গা ঘেঁষে একটি বুনো শিয়াল শুয়ে আছে। আমি ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম। আজ এত বছর পর সেই ভয়ের দিনগুলোর কথা ভাবলেও আমার চোখে জল চলে আসে।
দৈনিক করতোয়া: এত নির্যাতন ও প্রতিকূলতার পর কখনো কি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হয়েছে?
সুরাইয়া জেরিন রনি: না, কখনোই রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হয়নি। বরং প্রতিটি আঘাত আর প্রতি মুহূর্তের লড়াই আমাকে আরও দৃঢ় করেছে। স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে দেশকে মুক্ত করা এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে অটল থাকাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলন যখন শুরু হলো, তখন আমি আমার একমাত্র কন্যা সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের শুরু থেকে একদম স্বৈরাচারী সরকারের পতন হওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজপথে লড়াই করেছি। পুলিশের বন্দুকের নল ও বুলেটের মুখে বুক পেতে দাঁড়িয়েছি।
আন্দোলন চলাকালীন বগুড়ার গাবতলীতে একটি অত্যন্ত নির্মম ও রক্তাক্ত ঘটনা ঘটেছিল। আমাদের গাবতলীর যুবদল নেতা জিল্লুর রহমান এবং আমি একদম কাছাকাছি দূরত্বে ছিলাম। একপর্যায়ে পুলিশ যখন নির্বিচারে গুলি শুরু করে, আমরা জীবন বাঁচাতে দৌড় দিচ্ছিলাম। দৌড়ানোর সময় আমি হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে যাই এবং মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তার পাশের আইল্যান্ডে গিয়ে উঠি। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে জিল্লুরকে গুলি করা হয়।
দৈনিক করতোয়া : রাজনৈতিক নেত্রী এবং একই সঙ্গে সাংসদ হিসেবে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের নারীদের জন্য কী কী করতে চান?
সুরাইয়া জেরিন রনি : একজন নারী হিসেবে দেশের নারীদের নিয়ে আমার অনেক বড় পরিকল্পনা আছে। নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশিক্ষা এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে আমি ব্যাপকভাবে কাজ করতে চাই। সবসময় সাধারণ নারীদের পাশে থেকে তাদের সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। দিনশেষে আমরা সমাজ থেকে লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে চাই। নারীকে শুধু নারী বা পুরুষকে শুধু পুরুষ না ভেবে, আমরা সবাই যেন প্রকৃত ‘মানুষ’ হিসেবে একে অপরকে মূল্যায়ন করতে পারি সেই মানবিক সমাজ বিনির্মাণ করাই আমার মূল লক্ষ্য।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








