ভিডিও বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৬ মে, ২০২৬, ০৪:১৪ দুপুর

বিভাজনের রাজনীতি: উত্তরণের অনিবার্যতা

সমাজ ভেঙে পড়তে শুরু করলে তার শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু তার প্রভাব প্রতিদিন অনুভূত হয়। আমরা কি সত্যিই এগোচ্ছি, নাকি একই বিভক্তির বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি? এই প্রশ্ন আজ আর কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের নীরব অভিজ্ঞতা। উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনার নানা পরিসংখ্যান আমাদের আশাবাদী করে। কিন্তু সেই আলোচনার আড়ালেই জমে ওঠে এক ধরনের অদৃশ্য অস্বস্তি— পারস্পরিক অবিশ্বাস, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি। গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা দেখায়, মতভেদকে শক্তিতে রূপান্তর করার পরিবর্তে আমরা প্রায়ই সেটিকে বিভাজনের উপাদানে পরিণত করেছি। “আমরা” ও “তারা” এই সরল বিভাজন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে পরিবার, বন্ধুত্ব, এমনকি অর্থনৈতিক সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিন্ন মত মানেই দূরত্ব এই ধারণা আমাদের সামাজিক বন্ধনকে নীরবে ক্ষয় করছে। এই বাস্তবতার একটি পরিচিত চিত্র আমরা প্রায়ই দেখি একটি পরিবারে বা বন্ধুদের আড্ডায় ভিন্ন রাজনৈতিক মত প্রকাশের পর হঠাৎ নীরবতা নেমে আসে, সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়। এটি হয়তো বড় কোনো সংঘাত নয়, কিন্তু এই ছোট ছোট ফাটলই একসময় বড় বিভাজনের ভিত্তি তৈরি করে। সমাজ ভাঙে বড় ঘটনায় নয়, বরং এমন অসংখ্য ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্নতায়। 
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা থাকে অভিভাবকের মতো যিনি দিকনির্দেশনা দেবেন, আস্থা গড়ে তুলবেন এবং বিভক্তিকে সংহতিতে রূপ দেবেন। কিন্তু যখন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কল্যাণের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ প্রাধান্য পায়, তখন সেই আস্থা ক্ষয় হতে থাকে। মানুষ তখন প্রশ্ন করে নেতৃত্ব কি ভবিষ্যৎ নির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, নাকি কেবল বর্তমানকে সামাল দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এই আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে তোলে কিছু দৃশ্যমান প্রবণতা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল, গণউত্তেজনা কিংবা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা। এগুলো হয়তো সর্বত্র সমান নয়, কিন্তু এদের পুনরাবৃত্তি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: ন্যায়বিচার সব সময় সমানভাবে কার্যকর নয়। যখন নাগরিকরা এই বিশ্বাস হারাতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতার বিস্তার। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক সময় মানুষ নিজেরাই একই ধরনের আচরণকে ন্যায্যতা দিতে শুরু করে। “ওরা করেছে, আমরা করলে দোষ কী” এই যুক্তি ধীরে ধীরে সামাজিক স্বীকৃতি পায়। এর সঙ্গে যখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার প্রবণতা যুক্ত হয় “আগে কিছু করি, পরে দেখা যাবে” তখন পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। প্রতিহিংসা ও বিরূপতার এই চক্র সমাজের নৈতিক ভিতকে নীরবে ক্ষয় করে। এই বিভাজনের পরিবেশ থেকে কিছু স্বার্থগোষ্ঠী সুবিধা নেয় এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। যখন সমাজ “আমরা” ও “তারা” এই দ্বন্দ্বে ব্যস্ত থাকে, তখন নীতি-নির্ধারণের মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে পড়ে যায়। ফলে এমন একটি কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে বিভাজন টিকে থাকাই লাভজনক হয়ে ওঠে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নীতি-অগ্রাধিকারের বিকৃতি এবং সম্পদের অদক্ষ বণ্টন যা উন্নয়নের গতি ধীর করে দেয়, কখনো কখনো বিপথেও নিয়ে যায়। তবে এই বাস্তবতা অনিবার্য নয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে সমাজ চাইলে নিজেকেই সংশোধন করতে পারে। সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হলো আস্থার পুনর্গঠন। একটি রাষ্ট্র তখনই স্থিতিশীল হয়, যখন তার নাগরিকরা বিশ্বাস করে আইন সবার জন্য সমান, অধিকার সুরক্ষিত এবং ভিন্ন মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত। এই আস্থা গড়ে তোলার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নয়; এটি একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। একজন ব্যবসায়ী যখন স্বচ্ছতা বজায় রাখেন, একজন শিক্ষক যখন সহনশীলতা ও যুক্তিবোধ শেখান, একজন নাগরিক যখন যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকেন তখনই একটি দায়িত্বশীল সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি হয়। বড় পরিবর্তনের বীজ লুকিয়ে থাকে এই ছোট ছোট দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যেই।

পরিবার এই পরিবর্তনের প্রথম বিদ্যালয়। পরিবারই শেখায় ভিন্ন মত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সম্মান বজায় রাখতে হয়, কীভাবে মতভেদকে সংঘাতে নয়, সংলাপে রূপ দিতে হয়। পরিবারে যদি সহনশীলতা, শ্রদ্ধা ও যুক্তির চর্চা গড়ে ওঠে, তবে তার প্রতিফলন বৃহত্তর সমাজেও অনিবার্য হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কর্মসংস্থান, ন্যায়সঙ্গত ব্যবসা পরিবেশ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থা তৈরি করে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি অনেক সময় বিভক্ত সমাজেও সংযোগের সেতু হিসেবে কাজ করে। সবশেষে, একটি কঠিন কিন্তু অপরিহার্য সত্য স্পষ্ট স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ কোনো আকস্মিক অর্জন নয়; এটি সচেতন সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক ফল। বিভক্তির বৃত্ত ভাঙতে প্রয়োজন ধৈর্য, সংযম এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। 

আমরা হয়তো এখনও সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পথ বেছে নেওয়া সম্ভব। একদিকে আছে সহজ কিন্তু বিভাজনময় স্বস্তি; অন্যদিকে কঠিন কিন্তু টেকসই সহাবস্থান। প্রশ্ন একটাই আমরা কি সাহস করে কঠিন পথটি বেছে নেব, নাকি পরিচিত বিভাজনের আরামেই নিজেদের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখব?

আরও পড়ুন


লেখকঃ

ফারুক আহম্মেদ

সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিভাজনের রাজনীতি: উত্তরণের অনিবার্যতা

কুমিল্লায় ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা

হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপে একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করল ইরান

কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় স্কুলছাত্র আহত

পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে ইতিহাস গড়তে চাই : সিমন্স

মুন্সীগঞ্জে বলাৎকারের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার