ভিডিও মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ১৭ মার্চ, ২০২৬, ০৬:০২ বিকাল

খাল খনন: গ্রামীণ আর্থ—সামাজিক উন্নয়নে এক যুগান্তকারী কর্মসূচি

খাল খনন হলো সেচ, নিকাশ, নৌ—পরিবহন বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখার উদ্দেশ্যে মানবসৃষ্ট উপায়ে ভূমিতে দীর্ঘ ও সরু কৃত্রিম জলপথ তৈরি বা পুনঃখনন করার প্রক্রিয়া। এটি বন্যা ও খরা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আর গ্রামীণ আর্থ—সামাজিক উন্নয়ন হলো গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মান, আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামোগত কাঠামোর সামগ্রিক উন্নতি । এটি কৃষির আধুনিকায়ন, ক্ষুদ্রঋণ, কুটির শিল্প এবং নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। সরকার ও এনজিওর যৌথ উদ্যোগে অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির মাধ্যমে এই উন্নয়ন অর্জিত হয়।  শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের মনের খবর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই কৃষি প্রধান বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতির উপর বৈজ্ঞানিকভাবে জোর দিয়েছিলেন। আমরা জানি কৃষি উন্নয়নের পূর্বশর্ত ভালো বীজ, তাই বীজ উন্নয়নের জন্য বীজ প্রত্যয়ন বোর্ড গঠন থেকে শুরু করে, আধুনিক কৃষি বা কৃষি সংস্কার কর্মসূচি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খাদ্য সংগ্রহ ও সুষম বণ্টনের ব্যবস্থাপনার জন্য খাদ্য হিমাগার নির্মাণ, খাদ্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি, বিশেষ কৃষি ঋণ কর্মসূচি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড  প্রতিষ্ঠা, কৃষিতে প্রশিক্ষিত যুব সমাজ গঠন কল্পে যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠা এবং যুগান্তকারী খাল খনন কর্মসূচির মত বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি অবশ্যই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আর অন্তরে উৎসারিত দেশপ্রেম, মানব প্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। 

১৯৭৭ সাল, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর সরকার হাতে নেয় খাল খনন কর্মসূচির। দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষির উৎপাদন বাড়াতে যুগান্তকারী এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। কর্মসূচির লক্ষ্য ছিলো বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং যোগাযোগ ও পানিব্যবস্থা গড়ে তুলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের মডেল তৈরি করা। খাল খনন কর্মসূচি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন করা হয়। যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল। এর মাধ্যমে প্রায় ১৬ লাখ একর জমির অতিরিক্ত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য পুত্র আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিটি অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করে চলেছেন। আমরা দেখেছি নির্বাচনে ভোট দেয়ার কালি হাত থেকে মোছার আগেই তিনি ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রজেক্ট উদ্বোধন করেছেন। একইভাবে ৪৫ বছর পর, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আবারও সেই খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী—নালা—খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ৫৪টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খননের মাধ্যমে ‘দেশব্যাপী নদী—নালা—খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি গতকাল ১৬ই মার্চ উদ্বোধন করেন। প্রথম পর্যায়ের ১৮০ দিনে সম্পন্ন করা হবে ১২০০ কিলোমিটার।

আমি খাল খনন কর্মসূচির সামান্য তাৎপর্য তুলে ধরছি। খাল খনন কর্মসূচির বহুমাত্রিক সুবিধাজনক দিক আছে যা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রকৃতি সংরক্ষণ, মানব স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ইত্যাদি।

উৎপাদন বৃদ্ধি: আমরা জানি যে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে আমাদের দেশে শস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বর্ষা মৌসুমে উপচেপড়া পানি বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।  এই পানি খালে ধারণ করার ফলে শুষ্ক মৌসুমে তা অতি সহজেই ফসল উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে মাটির স্বাস্থ্য যথাযথভাবে রক্ষা করা সম্ভব। পানি খালে বা ভূ—উপরিস্থভাবে সংরক্ষিত হলে সেখানে বিভিন্ন প্রকার উপকারী পোকামাকড় যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে। একইভাবে ফসলের ক্ষতিকারক পোকার শত্রু যেমন: প্রিডেটর প্যারাসাইট, প্যারাসিটোয়েট প্রভৃতির উপস্থিতি থাকার ফলে কৃষি জমিতে জীব বৈচিত্র্যের সমারোহ তৈরি হয় যা শস্যে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার মাত্রা কমিয়ে শস্য, পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখে। যা টেকসই কৃষি বা বর্তমানে গুড এগ্রিকালচারাল প্রাকটিস বা গ্যাপ—এর পূর্বশর্ত। আই পি এম বা ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট এর মূল উদ্দেশ্যই হল বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের ন্যূনতম ব্যবহার যা খালে জমানো পানির ব্যবহারের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়।


পরিবেশ/প্রকৃতি সংরক্ষণ: বর্তমান পরিবেশ দূষণই বিশ্বের সবচাইতে বড় সমস্যা। পরিবেশ দূষণের মধ্যে বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণের পাশাপাশি পানি ও মাটি দূষণ অনেক বড় দূষণ যা খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে অনেকটা প্রশমিত করা সম্ভব। একটু উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। ভূ—উপরিস্থ পানির পরিবর্তে যদি ভূ—গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতেই থাকা হয় তবে, পানির স্তর নিচে নামতে থাকে। ভূ—গর্ভের নিম্নস্তর হতে আর্সেনিকের মত ভারি ধাতুর আগমন ঘটে যা মারাত্মকভাবে মাটি, শস্য ও পরিবেশ দূষণ ঘটায়। কারণ ভারী ধাতুসমূহ নন—বায়োডিগ্রেডেবল এবং নন থার্মোডিগ্রেডেবল হওয়ায় দ্রুতই টক্সিক বা বিষাক্ততার লেভেল বাড়তে থাকে। খালের পানি ব্যবহার করলে সব বিষাক্ততার ঊর্ধ্বে উঠে কৃষি উৎপাদনে পরিবেশ সংরক্ষিত হবে।

আরও পড়ুন


মানব স্বাস্থ্য ঝুঁকি রোধ: ভূ—গভর্ভু পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে পানিতে আর্সেনিকসহ অন্যান্য ভারী ধাতুর ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় আমাদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে আর্সেনিকপ্রবণ এরিয়াতে আর্সেনিক যুক্ত পানি ব্যবহার করায় বাংলাদেশে বাৎসরিক ২ মিলিয়ন মানুষ আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হচ্ছে। স্কিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ১ মিলিয়ন মানুষ। আর্সেনিক ইনডিউসড ক্যান্সারেও বছরে মৃত্যু হয় ৩০০০ জন মানুষের। ভারি ধাতু খাদ্য শস্যে জমা হওয়ার কারণে অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে হু হু করে। এই আলোচনায় এতক্ষণ নিশ্চয় বোধগম্য হয়েছে খাল খনন কর্মসূচি নিছক কোনো কর্মসূচি নয়। এটি একটি গতিশীল ও বৈজ্ঞানিক কর্মকৌশল যা শুধুমাত্র একজন বহুমাত্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকারী অত্যন্ত দূরদর্শী সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের পক্ষেই ভাবা সম্ভব। মন প্রাণ উজাড় করে দেশকে ভালোবাসা এবং দেশের মানুষের উন্নয়ন চিন্তার ফসল ছিল এই খাল খনন কর্মসূচি। 

তাইতো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতো এমন একজন কর্মবীর রাষ্ট্রনায়ককে স্যালুট জানাতে হয় অন্তর থেকে। কারণ তিনি তাঁর কর্মগুণে মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছিলেন, জোর করে খচিত কোন নির্মাণে নয়। 

তার ই ধারাবাহিকতায় গ্রাম প্রধান এই বাংলাদেশের আর্থ—সামাজিক উন্নয়নে খাল পূন:খননের মত যুগান্তরকারী কর্মসূচি বাস্তবায়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  তারেক রহমানের পরিকল্পনা সত্যিই প্রশংসনীয় । এই খাল খনন কর্মসূচি শুধুমাত্র যে কৃষির উন্নয়ন ঘটাবে তা নয় এর একটা অতি শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে যা যৎ সামান্যই উপরে বর্ণনা করা হয়েছে । তাই আসুন দূষণমুক্ত একটি সবুজ শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা দেশের জন্য সকলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিকে সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রাণান্তকর চেষ্টা করি।

অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অস্কারকে পাত্তা দিই না : হেমা মালিনী

খাল খনন: গ্রামীণ আর্থ—সামাজিক উন্নয়নে এক যুগান্তকারী কর্মসূচি

নতুন রূপে মেহজাবীন ও প্রীতম

ঢাবি সাংবাদিক সমিতির নতুন সভাপতি মাহি, সাধারণ সম্পাদক লিটন 

বগুড়ার জামিলনগরে সাবেক কাউন্সিলর এরশাদের ঈদ সামগ্রী বিতরণ

প্রথম ধাপে কৃষক কার্ড পাবেন ২২ হাজার কৃষক