কাম্য মূদ্রাস্ফীতি ও সহনীয় দামস্তরের মধ্যে সমন্বয় করাই চ্যালেঞ্জ
একটি নির্দিষ্ট সময়ের পণ্য সামগ্রীর গড় দামই দামস্তর, একই ভাবে কোন একক পণ্যের জন্য পূর্বের তুলনায় বেশী পরিমাণ অর্থ ধাবিত হওয়াই মূদ্রাস্ফীতি। বেসরকারি খাতে আয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না পাওয়া সত্ত্বেও বিগত সরকার নিজেদের ক্ষমতায় টিকিয়ে থাকার জন্য সরকারি কর্মচারীদের খুশি রাখতে বেতন-ভাতা দ্বিগুন করে। আবার একই সাথে পরিবহণ ভাড়া ৪৪% বৃদ্ধি করায় দামস্তর ও মূদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন গতি লাগামহীন হয়ে পড়ে যা আর নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বচ্ছ নির্বাচনবিহীন সরকার ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন এবং দামস্তরের উল্লম্ফনগতি সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে, ক্ষোভ একসময় জনরোষ পরে জনরোষ জনআন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময় অগ্নীতে ঘী ঢেলে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের কোটা বিরোধী আন্দোলন উপলক্ষ্যে সাংবাদিক সম্মেলনে পলাতক-সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেফাস কথা-বার্তা। অবশেষে সরকারের পতন ঘটে। ০৩ (তিন) দিন মসনদ শূন্য পড়ে থাকার পর ০৮ আগষ্ট ২০২৪ গঠিত হয় ক্রান্তিকালীন সরকার। ক্রান্তিকালীন বা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নিজেও একজন অর্থনীতিবিদ, তার সরকারে আরও কিছু বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ ছিলেন, কিন্তু, তারা কোন বিশেষ কারণে আগের সরকারের আমলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রেখে যাওয়া ব্যাংকগুলোর এবং শেয়ারবাজার পতন ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু, দামস্তর বা মূদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য চোখে পড়ার মত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এমন কোন উদাহরণ পাওয়া যায়না, বরং বাণিজ্য উপদেষ্টা দায়িত্ব গ্রহণ করেই সয়াবিন তেলের লিটার প্রতি দাম ১৭৫.০০ টাকা থেকে ১৮৯.০০ টাকায় নির্ধারণ করে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বসিয়েছেন। এর পর কখনও ডিমের ডজন ১৬০ টাকা, কখনও লেবুর হালি ২০০.০০ টাকা, কখনও মরিচের কেজি ৪০০.০০ টাকা শেষে ১২ কেজির এলপিজি গ্যাস ১২৫০.০০ থেকে ২৭০০.০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনতে হচ্ছে। নভেম্বর’ ২০২৫ এ মূদ্রাস্ফীতি ৮.৯%, আর্থিক সংকট অন্যদিকে মবের সংস্কৃতির মধ্যে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে থাকে এমনি এক সন্ধিক্ষণে দেশের লক্ষ-কোটি জনতা, বিএনপি কর্মী-সমর্থক ভালোবাসার সংবর্ধনা দিয়ে দূর দেশ থেকে প্রত্যাগত যুবরাজকে বরণ করেন। যেমন তার পিতা মরহুম শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান কে ১৯৭৫ সালে দেশের ক্রান্তিকালে সিপাহী-জনতা বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে ছিলেন। ভালোবাসা ও সমর্থনের ধারাবাহিকতায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে সরকার গঠন করে। এই সমর্থনের পিছনে এক একজনের প্রত্যাশা এক এক রকমের হবে এটাই বাস্তব। তবে মব ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পরিবর্তে জনগণ একবুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ও ঝামেলামুক্ত জীবনযাপন প্রত্যাশা করছে।
বনি ইসরাইল জাতিকে স্বয়ং আল্লাহ-তাআলাই তার কুদরতই খাবার মান্না ও সালওয়া পাঠাতেন (ওয়াজাল্লালনা-আলাইকুম গামা- মা ওয়া আনজালনা আলাইকুমুল-মান্না-ওয়াছালওয়া. .-সূরা-বাকারাহ, আয়াত-৫৭)। সেই সময়ে তাদের খাবারের চিন্তা করতে হত না। কিন্তু, সীমাবদ্ধ সম্পদের এই পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে মানুষের বহুমূখী চাহিদা ও অভাব দেখা দেয়। বিদ্যমান প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার জন্য মানুষ প্রতিনিয়ত কোন না কোন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান লাভের প্রতিযোগিতা, ছাত্রত্ব শেষে চাকুরি লাভের প্রতিযোগিতা, চাকুরি লাভের পর চাকুরিতে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা, ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা, ফুটবলে গোল দেওয়ার প্রতিযোগিতা, ক্রিকেটে রান নেওয়া ও উইকেট নেওয়ার প্রতিযোগিতা, রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা লাভ করে নির্বাচনে জয়লাভের প্রতিযোগিতা, যশ-খ্যাতি অর্জনের প্রতিযোগিতা, ব্যবসা ক্ষেত্রে ব্যবসা টিকে রাখা ও মুনাফা লাভের প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ক্ষেত্রে কম খরচে উৎপাদন ও অধিক মুনাফা লাভের প্রতিযোগিতাসহ নানা প্রকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করলে পরিদর্শক পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে। খেলোয়াড় ফাউল করলে রেফারি হলুদ বা লাল কার্ড দেখিয়ে খেলোয়াড়কে বহিষ্কার করে। অনুরূপভাবে, উৎপাদন কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যে অসদুপায় অবলম্বন করলে তা দেখার জন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা রয়েছে। এছাড়া ২০১২ সালে সরকার প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করে প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করেছেন। পণ্য উৎপাদনে উৎপাদকগণ যাতে অসুদপায় অবলম্বন করতে না পারে এবং উৎপাদক ও উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে প্রতিযোগিতা বজায় থাকে তা দেখভালের জন্য ০৫(পাঁচ) সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন কাজ করছে।
আমাদের দেশের বিভিন্ন বৃহৎ বাণিজ্য/শিল্প গ্রুপ সাধারণ কৃষক বা উৎপাদকদের কাছ থেকে স্বল্প মূল্যে পণ্য ক্রয় করে নিজেদের ব্র্যান্ড হিসাবে উচ্চ মূল্যে বিক্রয় করে অধিক হারে মুনাফা লাভ করে। মধ্যসত্বভোগী বা বৃহৎ গোষ্ঠিগুলো কক্সবাজার, মহেশখালীর কৃষকদের কাছ থেকে যে লবণ প্রতি কেজি ১২.০০-১৫.০০ টাকা দরে ক্রয় করে। সেই লবণ বিভিন্ন ব্র্যান্ডে প্যাকেটজাত হলে ভোক্তাকে প্রতি কেজি ৪০.০০ টাকা দরে ক্রয়করতে হচ্ছে।
আবার যে দেশে মিঠা পানির অভাব নেই সেই দেশে গ্রাহককে বোতলজাত পানি দুধের দরে কিনতে হচ্ছে। হাজারীবাগ বা পুরাণ ঢাকায় তৈরী হওয়া জুতা, সেন্ডেল, বৃহৎ গ্রুপ ক্রয় করে নিজেদের ব্র্যান্ড ও মনোগ্রাম লাগিয়ে বাজারে বিক্রয় করে। একইভাবে বগুড়ার ঢালাই শিল্প থেকে উৎপাদিত যন্ত্রপাতি বৃহৎ কোম্পানী নিজেদের ব্র্যান্ডে বাজারে উচ্চ মূল্যে বিক্রয় করে উচ্চহারে মুনাফা লাভ করে। আজ-কাল কৃষি পণ্য ধান-চালও বিভিন্ন কোম্পানী প্যাকেট করে নিজেদের ব্র্যান্ডে উচ্চ মূল্যে বাজারে বিক্রয় করছে। আবার, যে আলু উত্তরবঙ্গে ২.০০-৫.০০ টাকা কেজি, সেই আলু ঢাকায় ২০.০০- ৩০.০০ টাকা কেজি। যে টমেটো উত্তরবঙ্গে ২০.০০ টাকা কেজি, সেই টমেটো ঢাকায় ৪০.০০- ৮০.০০ টাকা কেজি। এই ব্যবধান কমাতে হবে যাত প্রকৃত কৃষক ও উৎপাদকগণ পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয়, আবার ভোক্তাও একটু স্বস্তিতে পণ্য ক্রয় করতে পারে ।
যথাযথ তদারকীর মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রতিযোগিতা বিরোধী অনুশীলনসমূহ নির্মূল করা গেলে, ব্যাংক ঋণবিতরণ সহজ করা, সরকারি বিভিন্ন লাইসেন্স প্রাপ্তির ঝামেলা, দুর্নীতিমুক্ত ও সহজ করা গেলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা উৎপাদনে আসতে আগ্রহী হবেন। তাদেরকে অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা করা গেলে দেশে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান ও গ্রুপের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। সমজাতীয় পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত নতুন নতুন উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়বে। উৎপাদন ও উৎপাদকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে একচেটিয়া কারবার লোপ পাবে। সকল প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বজায় রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণ উৎপাদনের উপকরণ হিসাবে কাচামাল ও শ্রমের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। নিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, বেকারত্ব হ্রাস পাবে। অন্যদিকে, উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বাজারে পণ্যের যোগান বৃদ্ধি পাবে। চাহিদা অনুপাতে পণ্যের যোগান বৃদ্ধি পেলে দামস্তর কমে মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আসবে, বাজার স্থিতিশীল থাকবে, মানুষের ভোগ, উপযোগ ও সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি ঘটবে।
প্রতিযোগীতাপূর্ণ বাজারে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন করলে, প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত পণ্যের গুনগত মানের উন্নতি ঘটবে, আবার উৎপাদন ব্যয় কমবে। ফলে আমাদের উৎপাদিত পণ্য অবাধ ও মুক্তবাজার ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে। একটি স্থিতিশীল উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্য বাজারজাত করা সহজ হবে।
আরও পড়ুনআমাদের দেশে ভোগ্য তেল (সয়াবিন), শিক্ষাপোকরণ (কাগজ), সাবান সহ বিভিন্ন সামগ্রীর উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, আমদানি বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠি পুঁজি কেন্দ্রীভূত করে বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের সুবিধামত আইন প্রণয়ন করিয়ে নেয়। এছাড়াও গোষ্ঠিগুলো প্রশাসনকে নানা অবৈধ সুযোগ সুবিধা দিয়ে কর ফাঁকি দেয়া সহ বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্য সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে জনগণের দূর্ভোগসৃষ্টি করে, যা ধর্মীয় ও আইন উভয় দৃষ্টিতেই অন্যায়। বিশেষ করে গণদ্রব্য যেগুলো সরকার নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাত করে থাকে যেমন, সিলিন্ডারজাত গ্যাস, চিনি ও অন্যান্য ভোগ্য পণ্যের সরকার নির্ধারিত মূল্য এবং ডিলার বা বাজারজাতকারীগণ ভোক্তাদের কাছে যে মূল্যে সরবরাহ করে তার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান বিরাজ করে। মাঝে মাঝে সরকারী সংস্থাগুলো বাজার মনিটরিং করে অবৈধ মুনাফাভোগী, কালোবাজারী, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে অবৈধ গুদামজাতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নিলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। পরিত্রাণের জন্য গণ ও জন সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, লিফলেট বিতরণ, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো, গবেষণা, সেমিনার, ওয়ার্কশপের আয়োজন করা, স্থানীয় পর্যায়ে বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ গুদামজাতকরণ, কালোবাজারী, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি রোধ করা গেলে বাজারে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বাজার স্থিতিশীল হবে। দামস্তর সহনীয় হবে মূদ্রাস্ফীতি কমার মধ্যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। অন্যথায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন
হবে।
লেখক :
মোঃ আব্দুল মালেক
প্রাবন্ধিক ও আইনজীবী
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক







