এবারের সংসদে ব্যবসায়ীই বেশি, কমেছে রাজনীতিবিদ : টিআইবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ৭৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ সদস্য কোটিপতি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ২৩৬ জন সংসদ সদস্য কোটিপতি এবং ১৩ জন শতকোটিপতি।
আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন ২০৯ জন বা ৭০ শতাংশ, সম্ভাব্য সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার দুজনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। তবে পেশায় রাজনীতিবিদের সংখ্যা সবচেয়ে কমে গেছে। ত্রয়োদশ সংসদের অর্ধেক সংসদ সদস্যই দায় বা ঋণ রয়েছে, সদস্যদের মোট দায় বা ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, যা বিগত চার সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। দলগতভাবে বিএনপিতে এই হার ৬২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীতে ১৬ শতাংশ।
টিআইবি বলছে, এবারের সংসদেও ব্যবসায়ী পেশার প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৬০ শতাংশ; যদিও দ্বাদশ সংসদের তুলনায় এয়োদশ সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ৫ শতাংশ কমেছে; যদিও নবম সংসদের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে, প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যাপক অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয় ছিল। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের মূল্যবোধের নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাবও পরিপন্থী আচরণ ক্রমাগত দৃশ্যমান হয়েছে। নির্বাচনি আচরণবিধি মান্য করার অঙ্গীকার করলেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। প্রার্থীরা তাদের নির্ধারিত খরচের সীমা অতিক্রমের চর্চা অব্যাহত রেখেছে।
প্রচারণা ব্যয়ের সীমা অনলাইন ও অফলাইন একক ও যৌথভাবে ব্যাপক লঙ্ঘিত হয়েছে, শীর্ষ দুই দল বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই লঙ্ঘনের মাত্রা সর্বাধিক। অফলাইন বা প্রত্যেক্ষ প্রচারণা ব্যয় লঙ্ঘন হয়েছে। নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ থেকে প্রায় ৩২৮ শতাংশ। শীর্ষে বিএনপি (৩২৭.৫%), স্বতন্ত্র (৩১৫.২%), জামায়াত (১৫৯.১%), জাতীয় পার্টি (১২৮.৬%), এনসিপি (১৯.০%)।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২.৩৬ শতাংশ, যা ২০০৮ সালের নবম সংসদের অর্ধেক এবং সবচেয়ে কম। এবারের সংসদ অপেক্ষাকৃত তরুণ, প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন ২০৯ জন বা ৭০ শতাংশ, সম্ভাব্য সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার দুজনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। সংসদের ৮৪.৮৩ শতাংশই স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ঊর্ধ্ব ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্নাতকোত্তর ৪৪.৮৩ শতাংশ। বিগত চারটি সংসদের তুলনায় এবারই সবচেয়ে বেশি শিক্ষক সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন, তবে সবচেয়ে কমে গেছে পেশায় রাজনীতিবিদের সংখ্যা।
আরও পড়ুনপ্রতিবেদনে উঠে আসে, ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের মধ্যে কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন। অনলাইন ও অফলাইন প্রচরণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি জ্বরে দল এবং প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন ও অনিয়ম করলেও কমিশনের সীমাবদ্ধতার কারণে পরাপরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। ফলে নির্বাচনে সব দল এবং প্রার্থীর জন্য প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র এবং সব শ্রেণির ভোটারদের জন্য পরিপূর্ণ সম-অধিকারভিত্তিক সুস্থ, নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সার্বিকভাবে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে আচরণবিধি প্রতিপালনে পরিপূর্ণ সফল হয়নি। কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন হলেও রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের অনেকের মধ্যে ‘বিজয়ী হতেই হবে’ এই চর্চা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরাতন রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ, অন্তঃকোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বেড়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতা এবং ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আগের মতো রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের ওপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের প্রয়াস ও সক্রিয়তা দৃশ্যমান ছিল। তবে রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক







