বেকারত্ব থেকে প্রভাবের অর্থনীতি: সমাজের অবস্থান ও দায়
যেখানে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবই হয়ে ওঠে আয়ের প্রধান উৎস।” “দেখি, না দিলে চলে না। আর দিলে মনে হয়, আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্যায়ের অংশ!” -এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কণ্ঠে ধরা পড়ে আমাদের সময়ের কঠিন বাস্তবতা। বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই চাঁদাবাজি এখন একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং ধীরে ধীরে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের কিছু কর্মী, এলাকা-ভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী ‘গডফাদার’দের সক্রিয় উপস্থিতি এই সমস্যাকে জটিল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
বর্তমান অবস্থা: প্রভাবের অর্থনীতি
রাজধানী ও বিভিন্ন জেলা শহরের কিছু এলাকা আজ “নিরাপদ নয়” বলে পরিচিত। গডফাদার-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল বা রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের সঙ্গে যুক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ছোট ব্যবসা, পরিবহন, নির্মাণ কাজ এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়-
- প্রশাসন রাজনৈতিক চাপের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না।
- অপরাধীদের বিচার হয় না।
- ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতেও ভয় পান। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার অভিযোগ বহুবার গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। কিন্তু অভিযোগের পরও দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব কম।
- সমস্যার গভীরতর কারণ: এককের নয়, কাঠামোর দায় চাঁদাবাজি শুধুমাত্র ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকট। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে-
১. বেকারত্ব: অর্থনৈতিক চাপের বাস্তবতা যখন তরুণদের সামনে সম্মানজনক আয়ের সুযোগ সীমিত থাকে, তখন তারা বিকল্প পথ খোঁজে। রাজনীতি তখন সেবার ক্ষেত্র না হয়ে “ক্যারিয়ার অপশন”-এ পরিণত হয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন- * পদ মানেই সুবিধা, * পরিচয় মানেই প্রভাব, * প্রভাব মানেই অর্থ উৎপাদনমুখী অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে রাজনৈতিক পরিচয়নির্ভর আয়ের প্রবণতা কমবে না। ২. ভুল রাজনৈতিক চর্চা: সংস্কৃতিগত সংকট যখন দলীয় আনুগত্য নৈতিকতার ওপরে স্থান পায়, তখন- * অপরাধ ঢেকে দেওয়া হয়। * “আমার লোক” সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। * শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এটি দলভেদে নয়; সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট। যদি কোনো বড় রাজনৈতিক দল নিজেদের কর্মীদের অপরাধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে একটি শক্ত বার্তা যায় দল অপরাধকে সমর্থন করে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে শুদ্ধি অভিযান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি খুব কমই দেখা যায়।
৩. সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকারিতা, যুব উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কাজ করছে- যেমন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বা পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই উদ্যোগগুলো কি যথেষ্ট কার্যকর? স্থানীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান ও ফলপ্রসূ কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বেকার যুবকদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি হয় না। ৪. বিচারহীনতা: সবচেয়ে বিপজ্জনক উপাদান বাংলাদেশে দন্ডবিধি, দুর্নীতি দমন আইন ও দ্রুত বিচার আইন সবই আছে। সমস্যা আইনের অভাব নয়; সমস্যা প্রয়োগে।
যখন মানুষ দেখে-“কিছুই হবে না”- তখন অপরাধ বাড়ে। ছোট অপরাধী ধরা পড়ে, কিন্তু প্রভাবশালীরা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে- এতে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। আইনের বাছাই প্রয়োগ চাঁদাবাজিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলে।
৫. সামাজিক দুর্বল বন্ধন একসময় এলাকায় সামাজিক লজ্জা ছিল। এখন- * অর্থ থাকলে সম্মান। * প্রভাব থাকলে গ্রহণযোগ্যতা। * অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন কম। সমাজ যখন অনৈতিক অর্থকে নীরবে মেনে নেয়, তখন চাঁদাবাজি সামাজিক বৈধতা পায়। পরিবার জানে, কিন্তু চুপ থাকে। নৈতিক প্রতিবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে। চক্রটি কীভাবে কাজ করে? বেকারত্ব * রাজনীতিতে প্রবেশ * ভুল চর্চা * প্রভাব * চাঁদাবাজি * বিচারহীনতা * সামাজিক স্বীকৃতি * অনুপ্রাণিত হয়ে আরও তরুণ একই পথে। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় চক্র। ভাঙতে হলে একাধিক স্তরে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: কী শেখা যায়?
সুইডেন-এ ÒActive Labour Market PoliciesÓ-এর মাধ্যমে যুবকদের স্কিল ট্রেনিং, বেকার ভাতা, শর্তসাপেক্ষ কর্মপ্রশিক্ষণ ও পুনঃনিয়োগ সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক প্রভাবনির্ভর আয়ের প্রবণতা কমেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক দলগুলো যুব নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ একাডেমি পরিচালনা করে, যেখানে নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার শিক্ষা দেওয়া হয়।এই উদাহরণ দেখায়- বিকল্প পথ তৈরি করলে অবৈধ পথের আকর্ষণ কমে।
উত্তরণের পথ: কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা- চাঁদাবাজির সংস্কৃতি ভাঙতে হলে আবেগ নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত উদ্যোগ। এটি আইন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ-সব স্তরে একসঙ্গে কাজ দাবি করে।
আরও পড়ুন১. দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ, শুধু অভিযান নয়-দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রয়োজন।
* দলীয় পরিচয় বা প্রভাব নির্বিশেষে মামলা ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। * তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। * ছোট অপরাধী নয়; মূল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনের প্রয়োগ যদি বাছাই করে হয়, তাহলে অপরাধ কমে না- বরং আরও সংগঠিত হয়। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে: “অপরাধ করলে রক্ষা নেই।” ২. কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, চাঁদাবাজি অনেক সময় বেকারত্বের সুযোগে জন্ম নেয়। তাই সমাধান কেবল শাস্তি নয়; বিকল্প পথ তৈরি করা।
* স্থানীয় শিল্প ক্লাস্টার গড়ে তোলার পাশাপাশি আয় উৎসারি কর্মকান্ডের প্রসার ঘটানো। * কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ। * রাজনৈতিক দল কর্তৃক কর্মীদের জন্য স্বচ্ছ উদ্যোক্তা পুনর্বাসন প্রোগ্রাম গ্রহণ ও নিষ্ঠার সাথে বাস্তবায়ন। যদি একজন তরুণ সম্মানজনক আয়ে যুক্ত হতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের প্রলোভন কমে যায়। অর্থনৈতিক শক্তি নৈতিক শক্তিকেও সহায়তা করে। ৩. রাজনৈতিক সংস্কার: ক্ষমতা নয়, দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে- * পদ মানেই সুযোগ নয়; দায়িত্ব। * দলীয় আচরণবিধি বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। * তৃণমূল পর্যায়ে নৈতিক ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ চালু করা। * অপরাধে জড়িত কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া। যখন দল নিজের ভেতর শুদ্ধি আনে, তখন সমাজে আস্থা ফিরে আসে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি না বদলালে প্রশাসনিক সংস্কারও টেকসই হয় না।
৪. সামাজিক জিরো টলারেন্স ও সম্মিলিত প্রতিরোধ, চাঁদাবাজি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সমাজ নীরব থাকে। * ব্যবসায়ী সমিতি, পরিবহন মালিক সমিতি, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে ঘোষণা দিতে পারে- “চাঁদা দেব না, অন্যায় মেনে নেব না।” * গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও নাগরিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। * স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিবাদকে সাংগঠনিক রূপ দিতে হবে। অপরাধীর শক্তি তার প্রভাব নয়; ভুক্তভোগীদের বিচ্ছিন্নতা। ঐক্য গড়ে উঠলে চাঁদাবাজি টিকে থাকতে পারে না।
৫. নৈতিক ও পারিবারিক পুনর্গঠন, সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন শুরু হয় পরিবার থেকে। * সন্তান কীভাবে অর্থ উপার্জন করছে- এই প্রশ্ন করা অভিভাবকের দায়িত্ব। * শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ব ও আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। * ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন- চাঁদাবাজি শুধু বেআইনি নয়; অনৈতিক। যখন সমাজ অসৎ অর্থকে সম্মান দেওয়া বন্ধ করবে, তখন চাঁদাবাজির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ভেঙে পড়বে।
চাঁদাবাজির সংস্কৃতি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভুল রাজনৈতিক চর্চা, বিচারহীনতা ও সামাজিক নীরবতার সম্মিলিত ফল। কিন্তু ইতিহাস বলে- সংস্কৃতি যেমন গড়ে ওঠে, তেমনি পরিবর্তনও সম্ভব। চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের সম্মিলিত দায়। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ সংস্কৃতি ভাঙা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন নৈতিক সাহস, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং বিকল্প অর্থনৈতিক পথ নির্মাণ। প্রশ্ন শুধু নীতির নয়, সাহসেরও। পরিবর্তন আকাশ থেকে নামবে না- আমাদের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু হবে।
লেখক
মো : ফারুক আহম্মেদ
প্রাবন্ধিক ও ব্যাংকার
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








