ভিডিও মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রকাশ : ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১১:২০ দুপুর

বগুড়ার কমল থেকে বিশ্ব মানবতার জিয়াউর রহমান

আকাশের উদারতা আর স্বর্গের মত শান্তি নিয়ে যেসব মহাপুরুষের মর্ত্যে আবির্ভাব ঘটে তাঁদের দ্বারা সমাজের যথার্থ কল্যাণই শুধু সাধিত হয় না, বিশ্ব পায় এক প্রশান্তির পরশ যা সৃষ্টিকর্তার পরম ইচ্ছার প্রতিফলন। এমনি এক মহাপুরুষের জন্ম হয় ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে। যার ডাক নাম ছিল কমল। কমল  শব্দের অর্থ হলো পদ্ম ফুল । এটি মূলত সংস্কৃত শব্দ থেকে বাংলায় এসেছে । কমল শব্দটি বিশেষ্য পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও নির্মলতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত । পুরো নাম জিয়াউর রহমান  রসায়নবিদ বাবার চাকরির কল্যাণে তাঁর শৈশবের কিছু সময় কলকাতায় কাটে। ভারতবর্ষ বিভক্তির পর বাবা চাকরির জন্য বদলি হয়ে করাচিতে গমনে তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুল ছেড়ে করাচি একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। ঐ বিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং তারপর ১৯৫৩ সালে করাচিতে ডি.জে, কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালেই তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার ক্যাডেট রূপে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদবীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। সামরিক বাহিনীতে তিনি একজন সুদক্ষ ছত্রীসেনা ও কমান্ডো হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেন এবং স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। করাচিতে দুই বছর কর্মরত থাকার পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে স্থানান্তরিত হয়ে আসেন। তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ঐ সময়ই ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর শহরের বালিকা, খালেদা খানমের সঙ্গে জিয়াউর রহমান বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধে দুর্ধর্ষ সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য যেসব কোম্পানি সর্বাধিক বীরত্বসূচক পুরস্কার লাভ করে, জিয়াউর রহমানের কোম্পানি ছিলো এদের অন্যতম। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে হিলাল-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত করে। এছাড়াও জিয়াউর রহমানের ইউনিট এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য দুটি সিতারা-ই-জুরাত এবং নয়টি তামঘা-ই-জুরাত পদক লাভ করেন।

১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। সে বছরই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটাস্থিত কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদবীতে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের দায়িত্ব লাভ করেন। অ্যাডভান্সড মিলিটারি অ্যান্ড কমান্ড ট্রেনিং কোর্স নামক একটি উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানিতে যান এবং কয়েক মাস ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথেও কাজ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের দায়িত্ব লাভ করেন। দেশের সেবায় নিয়োজিত হয়ে দেশমাতৃকার তিনি অকুতোভয় বীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ঠিক তেমনিভাবে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের নিরিখে শোষিতের পক্ষে মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য কাজ করেছেন। এমনিভাবে সকল বাধা বিপত্তি ও নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে মুক্ত করার কাজে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে সর্বস্তরের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

অনেকে স্বাধীনতা ঘোষণার দাবিদার হলেও যে কণ্ঠস্বরটি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে ভেসে এসে আপামর জনসাধারণের মনে স্থায়িত্ব পায় তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই দেশমাতৃকা সেবায় পরিপূর্ণ দরাজ-গলায় উচ্চারিত। মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তারপর ২৬ মার্চ বেতার কেন্দ্রের কর্মীদের সহায়তায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার পর মেজর জিয়া এবং তাঁর বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং বেশ কয়েকদিন তারা চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে কৌশলগতভাবে তারা সীমান্ত অতিক্রম করেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে প্রথমে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন এবং চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী প্রভৃতি স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। তিনি সেনা-ছাত্র-যুব সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই তিনটি ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রথম নিয়মিত সশস্ত্র ব্রিগেড জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং তারপর জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত যুগপৎ ১১ নম্বর সেক্টরের ও জেড-ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাঁকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

জিয়াউর রহমান ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সেনাপ্রধান হন। খালেদ মোশাররফ যখন শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে ঢাকা ব্রিগেডের সমর্থনে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে একটি অভ্যুত্থান ঘটায়, তখন জিয়াউর রহমান তাঁর কমান্ড পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং গৃহবন্দি করা হয়। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব তাঁকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তিনি একটি জননন্দিত দল গঠন করে সকল রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা কল্পে তাঁর যে অবদান সেই জন্যই সকল শ্রেণী পেশার মানুষ তাঁকে রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে নিজেদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছে। তিনিও বাংলাদেশের মানুষের মনের খবর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই কৃষি প্রধান বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতির উপর বৈজ্ঞানিকভাবে জোর দিয়েছিলেন। আমরা জানি কৃষি উন্নয়নের পূর্বশর্ত ভালো বীজ, তাই বীজ উন্নয়নের জন্য বীজ প্রত্যয়ন বোর্ড গঠন থেকে শুরু করে, আধুনিক কৃষি বা কৃষি সংস্কার কর্মসূচি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খাদ্য সংগ্রহ ও সুষম বণ্টনের ব্যবস্থাপনার জন্য খাদ্য হিমাগার নির্মাণ, খাদ্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি, বিশেষ কৃষি ঋণ কর্মসূচি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড  প্রতিষ্ঠা, কৃষিতে প্রশিক্ষিত যুব সমাজ গঠন কল্পে যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠাএবং যুগান্তকারী খাল খনন কর্মসূচির মত বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি অবশ্যই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আর অন্তরে উৎসারিত দেশপ্রেম, মানব প্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। 

আরও পড়ুন

এমন একজন কর্মবীর রাষ্ট্রনায়ককে স্যালুট জানাতে হয় অন্তর থেকে। কারণ তিনি তাঁর কর্মগুণে মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছিলেন, জোর করে খচিত কোন নির্মাণে নয়। 

লেখক :

অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার

শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ার কমল থেকে বিশ্ব মানবতার জিয়াউর রহমান

ঈদযাত্রার বাস-ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু

সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক থেকে উদ্ধার গলায় ছুরিকাঘাতে আহত শিশুর মৃত্যু

ইরানে ‘রক্তপাতের অবসান’ চান এরদোয়ান

কাতারের দোহায় ফের বিস্ফোরণ

নির্বাচনে কারচুপির পরেও সংসদে যাবে জামায়াত: পরওয়ার