বগুড়ায় নিত্যদিন অপমৃত্যু
মাসুদুর রহমান রানা : বগুড়ায় আশংকাজনকভাবে বাড়ছে অপমৃত্যুর ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন স্থানে মানুষের অপমৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে আত্মহত্যা ও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের অপমৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে। এ ছাড়া পানিতে ডুবে, বিদ্যুতায়িত হয়ে, আগুনে পুড়ে, ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে, বজ্রপাতে, সাপের কামড়ে, উচু ভবন থেকে নিচে পড়ে গিয়েসহ নানাভাবে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
বগুড়া জেলা পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যনুয়ায়ী গত বছর ২০২৫ সালে জেলার ১২টি উপজেলায় আত্মহত্যা করেছে ৪১১ জন এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ১২০ জন নিহত হয়েছে। এরমধ্যে শুধু আত্মহত্যা জনিত কারনে ও সড়ক দুর্ঘটনায় জেলায় এক বছরে অপমৃত্যু হয়েছে ৫৩১ জনের। পুলিশ সূত্র বলছে, বগুড়ায় এমন অপমৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে।
অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এমন একটি দিনও নেই। প্রতিদিনই অপমৃত্যুর শিকার হচ্ছে সব বয়সী মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই রক্ত ঝরছে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধের। ট্রেনে কাটা পড়েও মানুষের অপমৃত্যু ঘটছে। এছাড়া বিষপানে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে, চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে, ঘুমের বড়ি খেয়ে, শরীরে আগুন দিয়ে এবং নদীতে ঝাঁপ দিয়ে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছেই।
এদিকে, বগুড়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। গত বছর ২০২৫ সালে জেলার ১২টি উপজেলায় ৪১১ জন আত্মহত্যা করেছে। আত্মহননকারীদের একটি বড় অংশই হলো নারী ও শিক্ষার্থী। হতাশা, বিষন্নতা, প্রেম ঘটিত বিষয়সহ নানা কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
জেলা পুলিশ সূত্রে পাওয়া এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালে এ বছরে বগুড়া জেলায় ৪১১ জন আত্মহত্যা করে। তার মধ্যে সদরে ১০০ জন, শাজাহানপুরে ৩২ জন, শিবগঞ্জে ৩৭ জন, সোনাতলায় ২০ জন, গাবতলীতে ২৬ জন, সারিয়াকান্দিতে ২৭ জন, আদমদিঘীতে ৩৫ জন, দুপচাঁচিয়ায় ৩৭, নন্দীগ্রামে ১৬, কাহালুতে ২১, শেরপুরে ৩২ ও ধুনটে ২৮ জন আত্মহত্যা করেছে।
এছাড়া ২০২৪ সালে জেলায় ৩৩৫ জন, ২০২৩ সালে ৩৮৭ জন ও ২০২২ সালে ৩৮৫ জন করে। সব মিলিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে বগুড়া জেলায় মোট এক হাজার ৫১৮ জন আত্মহত্যা করেছে। অপরদিকে, গত বছর ২০২৫ সালে বগুড়া জেলায় সড়কে নিহত হয়েছে ১২০ জন মানুষ। এসব মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যু বা অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১২০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ১১৩টি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া সদর থানায় ২৬টি, শাজাহানপুর থানায় ১৮টি, শিবগঞ্জ থানায় ১৫টি, সোনাতলা থানায় ১টি, গাবতলি থানায় ৪টি, সারিয়াকান্দি থানায় ১টি, আদমদিঘী থানায় ৫টি, দুপচাঁচিয়া থানায় ৪টি,নন্দীগ্রাম থানায় ১৩টি, কাহালু থানায় ৪টি, শেরপুর থানায় ২১টি ও ধুনট থানায় ১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে জেলায় মামলা হয়েছিল ১২৫টি।
আরও পড়ুনবগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. আতোয়ার রহমান বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক কারনে হতাশা থেকে মানুষ বেশি আত্মহত্যা করে থাকে। গলায় ফাঁস দিয়ে ও বিষপানেই বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন আইন প্রয়োগ করে আত্মহত্যা ঠেকানো সম্ভব নয়। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু সায়েম বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। মূলত হতাশা থেকে মানুষ আত্মহত্যা করছে।
শারিরিক, মানসিক কারণে ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক কিশোর-কিশোরী, তরুণ, তরুণী,নারীসহ সব বয়সী মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সিজোফেনিয়া, উদ্বেগ ও গোলযোগসহ নানা কারনে মানুষ আত্মহত্যা করছে। তিনি বলেন, কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কাউন্সিলিং করতে হবে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের বগুড়া জেলা সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান বলেন, সড়কে মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে গণ সচেতনতা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শুধু আমাদের পরিবহন ব্যবস্থাই দায়ী নয়, আমরা নিজেরাও দায়ী। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হলেও তার কার্যকারিতা অনেক কম। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত আইন থাকলেও তা অনেক দুর্বল।
আবার যা আছে তারও যথাযথ প্রয়োগ নেই। দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যুগোপযোগী আইনের অভাব, অপরিকল্পিত সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, সড়ক-মহাসড়কের পাশে হাট-বাজার, পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার অভাব, অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ব্যবহার, সড়ক-মহাসড়কে অতিরিক্ত বাঁক, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো ও চলন্ত অবস্থায় মোবাইলফোনে কথা বলা বিভিন্ন কারণে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে, এ কারণে বাড়ছে অপমৃত্যু।
মন্তব্য করুন









