ভিডিও শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৪:৫৯ দুপুর

নির্বাচন ও তারুণ্যের ভাবনা

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। দশকের পর দশক ধরে যে ক্ষমতার বিন্যাস ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলমান ছিল, তার ভিত কেঁপে উঠেছে। তরুণরাই কাঁপনের কেন্দ্রে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়-স্কুল-কলেজ, শহর-গ্রাম, অফলাইন-অনলাইন সব জায়গার তরুণরা নানাভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। তাদের অংশগ্রহণ সংগঠিত বা দলভিত্তিক ছিল না; বরং তা ছিল সচেতনতা, ক্ষোভ, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগের মিশ্র রূপ। এখন প্রশ্ন হলো, এই তরুণরা আগামী নির্বাচন সম্পর্কে কী ভাবছে? তারা রাজনীতির কাছে কী প্রত্যাশা করছে? আর রাজনৈতিক দলগুলো কি সত্যিই তা শুনতে প্রস্তুত? নির্বাচনের বিষয়ে বর্তমান প্রজন্মের ধারণা পুরোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশ আলাদা। তাদের কাছে নির্বাচন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ক্ষমতার স্থানান্তর নয়; বরং রাষ্ট্রের কাঠামো ও উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। তারা দেখেছে দুর্বল নির্বাচন কেবলই বিতর্ক সৃষ্টি করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সামাজিক আস্থা কমিয়ে দেয়। আর শক্তিশালী নির্বাচন ভবিষ্যৎকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করে। সুতরাং তরুণদের ভাবনার গভীরে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ এখন একটি মূখ্য শব্দ।

তরুণদের প্রত্যাশার প্রথম স্তরটি নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রশ্নে। কিন্তু অভ্যুত্থান তরুণ প্রজন্মের চোখে এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা মনে করে, আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে অগত্যা নতুন মুখ দরকার; শুধু বয়সের কারণে নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, জলবায়ু, তথ্য নিরাপত্তা- এগুলো নতুন বাস্তবতা; ফলে পুরোনো ভাষা ও স্লোগান দিয়ে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে দলগুলো যদি তরুণদের সঙ্গে সমানভিত্তিক কথোপকথন না করে, তাহলে তাদের আস্থা অর্জন কঠিন হবে। দ্বিতীয় স্তরটি হলো রাজনীতির প্রতি আগ্রহ। আগের প্রজন্ম অনেক সময় নেতা ও দলের প্রতি আবেগ বা আনুগত্য দিয়ে অবস্থান নিয়েছে; বর্তমান প্রজন্ম অবস্থান নেয় বিষয়-ভিত্তিক দাবির ওপর। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্টার্টআপ অর্থনীতি, উদ্যোক্তা সহায়তা, মানবাধিকার, ডিজিটাল স্বাধীনতা, সাইবার সুরক্ষা, নারী-পুরুষ সমতা, স্বাস্থ্যসেবা, বিচারব্যবস্থা- এসবই তরুণদের বাস্তবতাকে নির্ধারণ করে। তাই তারা জানতে চায়, দলগুলোর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত? সে প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে?  তৃতীয় বিষয়টি হলো জবাবদিহিতা। তরুণরা দেখেছে ক্ষমতার প্রশ্নে চূড়ান্ত পরিবর্তন ঘটে জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই। তাই তারা বোঝে, নির্বাচন একদিনের ঘটনা নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় সরকারের কাজ পরিমাপ, ব্যাখ্যা ও সমালোচনার সুযোগ থাকতে হবে। তাই আগামী নির্বাচনে তারা শুধু ভোট দিতে চায় না, ভোটের পর রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে তারও হিসাব চাইছে। তরুণদের আরো বড় একটি উদ্বেগ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে। সাম্প্রতিক আন্দোলন এই বাস্তবতা উন্মুক্ত করেছে যে, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হলে প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৃজনশীলতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে যত কম বিনিয়োগ হয়, রাষ্ট্র তত পিছিয়ে যায়। ফলে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষার পরিবর্তন ও আধুনিকীকরণ আজ একটি প্রধান বিষয় এবং তরুণরা মনোযোগ দিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তরুণদের কাছে কেবল নৈতিক বিষয় নয় এটি তাদের কর্মকান্ড ও ভবিষ্যতেরও অংশ। টেক জগত, স্টার্টআপ, মিডিয়া ও গবেষণা- সবখানেই স্বাধীনতা প্রয়োজন। অতীতের নির্দিষ্ট সময়ের ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও ভয় শুধু ভিন্নমতকেই নয়, উদ্ভাবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তরুণরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আশ্বাস চাইছে যে রাষ্ট্র ভবিষ্যতে নাগরিকের মতকে সক্ষমতা হিসেবে দেখবে, হুমকি হিসেবে নয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই প্রত্যাশাগুলোর বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্ষমতা কতটা? নির্বাচন কেবল প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা নয়; বাস্তবতার সঙ্গেও এর সংঘাত আছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের জন্য সময়, দক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা লাগে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি একদিনেই তৈরি হয় না। তরুণরা এ বাস্তবতা বুঝে, কিন্তু তাই বলে তারা দাবি ছাড়েনি। রাজনীতির প্রতি তরুণদের যে একটি পরিবর্তিত মনোভাব তৈরি হয়েছে তা হলো, তারা এখন আর অরাজনৈতিক নয়। বরং দলনিরপেক্ষ, ইস্যুভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর। এটি রাজনীতির জন্য নতুন সুযোগ এবং একই সাথে চ্যালেঞ্জও। দলগুলো যদি এই মনোভাব গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তরুণদের আস্থা হারানো ছাড়াও তাদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর গণতন্ত্রে নাগরিকের বিচ্ছিন্নতা সবচেয়ে বড় ক্ষতি। গণঅভ্যুত্থান তরুণদের দেখিয়েছে যে পরিবর্তন শুধু সম্ভব নয়, প্রয়োজনে সাধনীয়ও। আর নির্বাচন তাদের সামনে সেই পরিবর্তনকে বৈধতা দেওয়ার একটি পথ খুলে দেয়। রাষ্ট্রের পরবর্তী অধ্যায় কীরূপ হবে তা এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, বরং রাজনৈতিক আলোচনাতেই নির্ধারণ হবে। আগামী নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার রূপরেখা বদলাবে না; বরং রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দেবে কি না সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, তরুণদের ভাবনার কেন্দ্রে আছে ভবিষ্যৎ, কিন্তু সেটি কোনো বিমূর্ত কল্পনা নয়। বাস্তবের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা প্রত্যাশা, যেখানে তাদের চাওয়া সুশাসন, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, তথ্যপ্রবাহের উন্মুক্ততা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা।

 
লেখক

আরও পড়ুন

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ৯৭ হাজার ভোটে জিতলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

পাবনা-১ আসনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী নিজামীপুত্র ব্যারিস্টার মোমেন

ভোট গণনায় হস্তক্ষেপ করছেন মির্জা আব্বাস: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

বগুড়ার ৭টি আসনে বিএনপির সব প্রার্থীর বিশাল বিজয়

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে মির্জা আব্বাসের নেতাকর্মীদের ভিড়