১২ গ্রামের মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার

১২ গ্রামের মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার

গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি : নন্দকুঁজা নদীতে ৫১ বছর খেয়ানৌকা বেয়ে মানুষ পারাপার করে চলছেন নারায়ন চন্দ্র দাস (৭২)। তার বাবা প্রফুল চন্দ্র দাসও  একই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নারায়ন চন্দ্র দাসের শারীরিক সক্ষমতা কমেছে। খেয়া বাইতে পারেন না তিনি। খেয়ার পরিবর্তে নদীতে তৈরি করেছেন বাঁশের সাঁকো। এ সাঁকোতে পারাপার হয় ১২ গ্রামের মানুষ।নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার পশ্চিম সীমান্তে নাজিরপুর ইউনিয়নের দুধগাড়ী কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন কালীরঘুন খেয়াঘাটে বাঁশের সাঁকোটি তৈরি করা হয়েছে। গ্রামবাসীর শত বছরের দাবী এখানে একটি ব্রীজ নির্মাণের। কিন্তু দাবিটি উপেক্ষিত হচ্ছে। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষকে।

নারায়ন চন্দ্র দাস জানান, তার জমিজমা নেই। পৈতৃক সূত্রে হাতে পেয়েছিলাম লগি-বৈঠা। এটাকে পুঁজি করেই খেয়া নৌকা টেনে সংসার চলছে। তার তিন ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলেরা অন্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ করছে। আমি স্ত্রী আর ছোট ছেলেকে নিয়ে এপেশাতেই রয়েছি।শরীরের শক্তি কমে গেছে। নৌকা টানার শক্তি নেই। তাই জীবিকার যোগান ঠিক রাখতে নদীতে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দিয়েছি। ২৫০ ফুট দীর্ঘ ও ৮ ফুট প্রস্থের এ সাঁকো তৈরি করতে প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে তার। ৪ বছর আগে এটা তৈরি হলেও ফিবছরই এটা সংস্কার করতে গড়ে আরো প্রায় ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয় তার।বিভিন্ন বে-সরকারি সংস্থা (এনজিও) সহ ধারদেনা করে এ টাকার যোগান দিয়েছেন তিনি। পরে গ্রামবাসীর কাছে পারাপারের চুক্তির  নগদ টাকা, ফসল তুলে সাঁকো তৈরির খরচের টাকার যোগান দিতে হয় তাকে। অবশিষ্ট যা থাকে তাতেই চলে সংসার।

তবে চুক্তির বাইরে যে সব মানুষ পারাপার হন, তাদের জনপ্রতি ২টাকা সাইকেলসহ ৫ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। প্রতি দিন গড়ে ১০০-১৫০ জন পারাপার হয়ে থাকেন বলে নারায়রন চন্দ্র দাস জানান। তিনি বলেন, ‘টাকা চাই না, একটা বিরিজ হলি- আমার এবং আমার স্বর্গীয় বাবা আত্মা শান্তি পায়’।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলার ১২টি গ্রামের মানুষকে বিভাজন করেছে নন্দকুঁজা নদী। এরমধ্যেনদীটির দক্ষিণে  রয়েছে গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের দুধগাড়ি, বৃন্দাবনপুর, চকনন্দরামপুর, গোপিনাথপুর, লক্ষিপুর, দড়িপাড়া, চন্দ্রপুর, উত্তরপারে সিংড়া উপজেলার  চামারী ইউনিয়নের কালীনগর, সোনাপুর, বাহাদুরপুর, রামপুর, শিবপুর, গোলকপাড়া গ্রাম। এছাড়া সিংড়ার বাহাদুরপুরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গুরুদাসপুরের বৃন্দাবনপুর ও চন্দ্রপুরেও অনুরুপ দুইটি বিদ্যালয় রয়েছে। গ্রামের মানুষের ফলস তোলা, নানা শ্রেণির মানুষ ও শিক্ষার্থীদের পারাপার  অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় বৃন্দাবনপুর ও বাহাদুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিত পাল এবং আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, শত বছরে রূপ-প্রকৃতি বদলেছে। বেড়েছে মানুষ ও সময়ের চাহিদা। খেয়া নৌকা বা বাঁশের সাঁকোতে জীবন আটকে থাকলে জাতির উন্নতি হবে না। দ্রুত একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হলে এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা আরো বদলে যাবে।সাব্বির, নদী, সজিব নামে তিন শিক্ষার্থী জানায়, বাঁশের সাঁকো দিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করি। অনেক সময় বেশি মানুষ উঠলে সাঁকো তুলতে থাকে। তখন ভয় হয়। একটা ব্রিজ হলে ভালো হয়। নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী বলেন, ব্রিজের দাবি জানিয়ে অনেক চেষ্টা তদবীর করেছি। কাজ হয়নি। জনস্বার্থে একটা ব্রিজ দরকার। বর্তমান চেয়ারম্যান শওকতরানা বলেন, সাঁকো নির্মাণে খরচ বেড়ে যাওয়ায় ঘাট মাঝি নারায়রন চন্দ্র দাসের কাছে ইজারার টাকা নেওয়া হয়নি। স্থানীয় সাংসদের কাছে ব্রীজের দাবী জানানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।স্থানীয় সাংসদ মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, এলাকায় অনেক ব্রিজ করেছি। আগামীতে এখানে ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।