রংপুরের মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে ভুক্তভোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না

রংপুরের মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে  ভুক্তভোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না

রংপুর জেলা প্রতিনিধি : মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনার জন্য সরকারি শর্তাবলীর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ সুযোগ-সুবিধা নেই রংপুরের মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে। এর ফলে নিরাময় কেন্দ্রগুলো থেকে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ রংপুরের অধিকাংশ মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে মোটা অংকের টাকা খরচ করেও কাঙ্খিত সেবা মিলছে না। ফলে নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেয়ার পর আবারো মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে তারা। নগরীর মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোর পরিচালকরা জানিয়েছেন, নিরাময় কেন্দ্রগুলো থেকে চিকিৎসা নেয়ার পর পরবর্তীতে রোগীর সঠিক পরিচর্যা ও রোগীর আচরনবিধি লক্ষ্য রাখা পরিবারের দায়িত্ব। যা অধিকাংশ পরিবারগুলো সঠিকভাবে পালন করেন না। যার ফলে ৭০ ভাগ রোগী অসৎ সঙ্গ ও বিভিন্ন প্ররোচনায় পুনরায় মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় সূত্র মতে, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার জন্য আবাসিক এলাকায় পাকা বাড়ি বা ভবন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নিরিবিলি সুন্দর পরিবেশ থাকতে হবে। একজন রোগীর জন্য কমপক্ষে ৮০ বর্গফুট জায়গা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যদিকে প্রতি ১০ বেডের জন্য পৃথক একটি টয়লেট, বাথরুম, বিশুদ্ধ পানি, অন্যান্য সুব্যবস্থা এবং খন্ডকালীন বা সার্বক্ষণিক একজন মনোচিকিৎসক, সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক, দুজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স, একজন সুইপার বা আয়া এবং জীবন রক্ষাকারী উপকরণ ও অত্যাবশ্যক ওষুধ থাকতে হবে। এ ছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তির রক্ত, কফ, মলমূত্র ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত যে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা থাকতে হবে। কেন্দ্রে একক বা দলগত পরামর্শক এবং মানসিক বিনোদনের জন্য অভ্যন্তরীণ খেলাধুলা, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন ও কাউন্সিলিংয়ের জন্য ২০ জনের উপযোগী একটি শ্রেণিকক্ষ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু রংপুরের কোনো মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে এসব সুযোগ-সুবিধা নেই বলে দাবি করেছেন একাধিক রোগীর স্বজনরা।

রংপুর নগীরর গুপ্তপাড়া এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈকবাসিন্দা ২০১৬ সালে কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছবি তোলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল তার। ওই সময় মাদকাসক্ত সহপাঠিদের সঙ্গদোষে হঠাৎই জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা সেবনে। ছয় মাসের মধ্যে ইয়াবায় তিনি পূর্ণ আসক্ত হয়ে পড়েন। এরপর তাকে নগরীর একটি নামকরা মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। সেখানে ৫ মাসের চিকিৎসা দেয়া হয় শরিফুলকে। এরপর সুস্থ হয়েছে বলে নিরাময় কেন্দ্র থেকে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাড়িতে আসার কিছুদিন পর অভিভাবকরা বুঝতে পারেন যে, শরিফুল আবারও ইয়াবা সেবন শুরু করছে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মূলত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে শরিফুলের সঠিক কাউন্সিল না করেই পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়েছে। একই অভিযোগ করেন নগরীর কামারপাড়া এলাকার অন্য আরেক বাসিন্দা। তিনি জানান, তার ১৫ বছরের ছেলে সঙ্গদোষে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এরপর তাকে নগরীর বেশ কয়েকটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সে পরবর্তীতে আবারো মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।

রংপুর নগরীর বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্র ঘুরে জানা গেছে, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে কমপক্ষে ৩ মাস চিকিৎসা গ্রহণ করতে হয়। সেক্ষেত্রে ভর্তি ফি বাবদ প্রতি মাসে নেয়া হয় ১০ হাজার টাকা। জানা গেছে, নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে দক্ষ কাউন্সিলের অভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা আসক্তি  থেকে বের হতে পারছে না।স্নেহা মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মনোয়ারুল কাদির মাসুম বলেন, শুধু আমার প্রতিষ্ঠান নয়, রংপুরের নিবন্ধিত কোনো মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ২০ ভাগের বেশি সুযোগ-সুবিধা নেই। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা  রোগীকে সঠিক কাউন্সিল ও চিকিৎসা প্রদানের চেষ্টা করি। তিনি আরও বলেন, নিরাময় কেন্দ্রগুলো থেকে চিকিৎসা নেয়ার পর রোগীর পরিচর্যার দায়িত্ব তার পরিবারের। কিন্তু অধিকাংশ রোগীর পরিবার রোগীর সঠিক পরিচর্যা ও তদারকি করেন না। যার ফলে পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে প্রায় ৭০ ভাগ রোগী আবার মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে।জীবনের আলো মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলো থেকে আমারা সাধ্যমত রোগীকে চিকিৎসা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু চিকিৎসা নেয়ার পর রোগীকে যদি সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে রোগীর পুনরায় মাদকে আসক্ত হওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আমি মনে করি।সুজন মহানগর কমিটির সভাপতি ও সাংবাদিক আফতাব হোসেন বলেন, সরকারিভাবে মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। বেসরকারিভাবে সঠিক সেবা নিশ্চিত করার কাজটি খুব কঠিন। অন্যদিকে এটি ব্যয় বহুল। তাই এ সমস্যার সমাধানে প্রতিটি জেলায় সরকারিভাবে মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করা দরকার।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আবু সুফিয়ান বলেন, যদি রংপুরের কোনো মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করা হয় এবং তা যদি প্রমাণিত হয় তাহলে ওই নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রংপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাসুদ হোসেন জানান, রংপুর নগরীতে নিবন্ধিত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে ৬টি। এগুলো হলো- স্নেহা, স্বপ্ন, জীবনের আলো, সুস্থ জীবন, শান্তি ও প্রধান। এছাড়াও নগরীতে বেশ কয়েকটি অনিবন্ধিত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। যেহেতু সরকারের পক্ষ থেকে রপুরে কোনো সরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র বা মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র নেই, তাই কিছু সীমাবদ্ধ থাকা সত্তেও ৬ টি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রকে নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। তবে এসব নিবন্ধিত নিরাময় কেন্দ্রের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে পরিচালকদের বলা হয়েছে। বিষয়টি তদারকির জন্য আমরা প্রতি মাসে নিরাময় কেন্দ্রগুলো ভিজিটও করি। আশা করি কিছু সময় সাপেক্ষে ওইসব নিরাময় কেন্দ্র থেকে কাক্সিক্ষত সেবা পাওয়া যাবে। তবে সরকারিভাবে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র খোলা হলে সব সমস্যার সমাধান হতো।