যুগপৎ আন্দোলনে বৃহত্তর ঐক্যের আশা বিএনপির

যুগপৎ আন্দোলনে বৃহত্তর ঐক্যের আশা বিএনপির

রাজকুমার নন্দী : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির বড় মনোযোগ এখন সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার দিকে। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করে খালেদা জিয়াকে নিয়ে নির্বাচনে যেতে চায় দলটি। তবে ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকাসহ নানা কারণে বিএনপির পক্ষে সরকারি জোটের বাইরে থাকা সব রাজনৈতিক দল ও জোটকে একই প্লাটফর্মে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই কৌশলগত কারণে ২০ দলকে আলাদা রেখে অন্য জোট বা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটি এখন অভিন্ন ইস্যুতে যুগপৎ কর্মসূচি-আন্দোলনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএনপির হাইকমান্ড মনে করছে, সময় এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে যুগপৎ আন্দোলন একটা পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মও গঠিত হয়ে যেতে পারে। বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমরা আন্দোলনে আছি। বিএনপি, ২০ দলীয় জোট, যুক্তফ্রন্ট, বামজোট, ড. কামাল হোসেনের ঐক্য প্রক্রিয়া-আমরা সবাই অভিন্ন দাবি নিয়ে কথা বলছি। সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে ন্যূনতম কয়েকটা দফায় আমরা ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন জোট, দল ও ফ্রন্টের কিছু দাবি এখন অভিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু প্লাটফর্ম এখনো আলাদা আলাদা রয়েছে। এই অভিন্ন দাবিগুলো আদায়ের জন্য যুগপৎ আন্দোলন হতে পারে। সম্ভাবনা এখন যুগপৎ কর্মসূচি বা আন্দোলনের। এরপর সময় এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এটা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেও রূপ নিতে পারে, ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গঠিত হয়ে যেতে পারে। বিএনপির এই নীতি-নির্ধারক বলেন, প্রথমে যুগপৎ আন্দোলন শুরু না করে কোনো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই হয়নি। পাকিস্তান পিরিয়ড এবং বাংলাদেশেও তার উদাহরণ আছে। অবশ্য সবাই এক প্লাটফর্মে দাঁড়ানোর আগেই যুগপৎ আন্দোলনে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন হয়ে যায়।

বিএনপির নেতারা বলছেন, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে যে ধরনের যুগপৎ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, এবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধেও তেমন একটা আন্দোলন গড়তে চাইছে বিএনপি। জানা যায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের নেতৃত্বে ৫ দলীয় জোট অভিন্ন তিন দফার ভিত্তিতে আলাদা আলাদা প্লাটফর্ম থেকে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। এরপর আন্দোলনের একপর্যায়ে গিয়ে তিন দফা এক দফায় পরিণত হয়। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় সাজা হওয়ার পর থেকে বেগম খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তিনি কারাগারে যাওয়ার আগে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। তারপর থেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সব রাজনৈতিক পক্ষকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টা ও তৎপরতা শুরু করে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, বেশ কয়েকটি বাম দল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম এমন কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এরপর গত ২৫ আগস্ট কারাগারে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওইদিন এক ঘন্টার আলাপে আন্দোলন ও নির্বাচন প্রস্তুতির পাশাপাশি বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের ঐক্য ঠিক রেখে বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করার তাগিদ দেন খালেদা জিয়া। নির্বাচন ও আন্দোলন সামনে রেখে দলীয় প্রধানের ওই নির্দেশনার পর সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার দিকে বড় মনোযোগ এখন বিএনপির।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণার আগে খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনের সময় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা এবং নেতা-কর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। এর মধ্যে বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিটি সর্বাগ্রে রয়েছে। কিন্তু বিএনপির সব দাবির সাথে একমত নয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলো। জামায়াতকে নিয়েও অধিকাংশ দলগুলোর আপত্তি রয়েছে। আবার দুই-একটি দল জাতীয় ঐক্যমঞ্চের প্লাটফর্মকে খালেদা জিয়ার মুক্তির মঞ্চ বানানোর বিপক্ষে। তবে কয়েকটি দল ও জোট এবং বিএনপির কিছু দাবি রয়েছে যেগুলো অভিন্ন। এগুলো হল-তফসিল ঘোষণার আগে সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা। এই চার দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, যুক্তফ্রন্ট, গণফোরাম ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের আট দল একমত। সম্প্রতি বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও পৃথক বিবৃতির মাধ্যমে এসব দাবির কথা জানিয়েছে তারা।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির নীতি-নির্ধারকেরা ঐক্য প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য দলগুলোর জন্য একটি প্রস্তাবনা বা ন্যূনতম শর্তের খসড়া তৈরি করেছেন। দলটির নীতি-নির্ধারকেরা আশা করছেন, দেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সুশাসনের স্বার্থে বিকল্পধারা, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্যসহ আরও কিছু দল ও জোটের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা হবে। এরপর তারা একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি আদায়ে আলাদা অবস্থান থেকে যুগপৎ আন্দোলন গড়তে সক্ষম হবেন। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন যে সমাবেশের ডাক দিয়েছেন, সেখান থেকে একটা বৃহত্তর ঐক্যের সূচনা হতে পারে। যদিও এই সমাবেশ হতে দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার কথাও বলছেন অনেকে।