মনোনয়ন ও পার্টি ককাস

মনোনয়ন ও পার্টি ককাস

হাসনাত মোবারক : রাজনৈতিক পরিভাষায় বহুল আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ পার্টি ককাস। ককাস হলো একটি বিষয়ে নীতিনির্ধারণী কমিটি বা ফোরাম। রাজনীতিতে পার্টি ককাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনের সময় টিকেট বা মনোনয়ন প্রদান করা। পার্টি ককাসের মাধ্যমে জাতীয় অন্তর্নিহিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় বলে মানি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে  ভোটাররা সাধারণত প্রতীককেই নির্বাচিত করে প্রার্থীকে নয়। ভোটার প্রার্থীর ইমেজকে গুরুত্ব দেয় না অনেক ক্ষেত্রে। এমনটি ঘটে  গণতন্ত্রের অনেকগুলো শর্তের অনুপস্থিতির জন্য।
বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন দৌড় ও দৌরাত্মের পার্টি ককাসের গুরুত্ব কতটুকু কিছুটা অনুমান করা গেছে। দু একটা ক্ষেত্রে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগও মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েছে। বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিরাজমান বলে জানতাম। বাট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোট-ভোটের মেরুকরণে প্রায় দ্বি-দলীয় সিস্টেমে রূপান্তর হওয়ার পরিক্রম। মনোনয়ন প্রত্যাশিদের নিয়ে যে খেলাটি  দেখা গেল। এটাকে ঘুরিয়ে ভানুমতির খেল বললেও অত্যুক্তি হবে না। ৪৭ বছরের রাজনীতির ইতিহাসে এবারই ঘটছে বা আরো ঘটতে যাচ্ছে মহানাটক। রাজনীতিতে একটা উক্তি প্রায়শ ব্যবহার হয় ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোনো কথা নাই।’ যাইহোক গণতান্ত্রিক সিস্টেমের মাধ্যমে সাধারণ ভোটাররা যেমন স্বাধীনভাবে নিজস্ব মতামত জ্ঞাপন করতে পারবেন। তেমনি রাজনীতিবিদগণও স্বাধীনভাবে দল ত্যাগ ও আদর্শের পরিপন্থী  বা জাতীয় স্বার্থের সাথে অমিল হলে নতুন দল গঠনের নজির দেখেছি। দলত্যাগের ঘটনা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রার্থিতা প্রত্যাহার এসব রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। নতুন দল গঠন বা দল ত্যাগের মানে এই নয় যে, সকালে এক দলের হয়ে মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ। মনোনয়ন প্রাপ্তিতে ব্যর্থ হয়ে বিকালে আরেক দলে এসে যোগদান করার নজির দেখতে হচ্ছে। এটা কোন ধরণের রাজনৈতিক আদর্শ বহন করে চলছেন আমাদের পথ প্রদর্শেকের নামান্তর রাজনৈতিকবৃন্দ! একজন সাবেক সংসদ সদস্য। সংসদের বাইরে তিনি বিভিন্ন আলোচনা সভায় যুক্তি তর্কে উচ্চমানের রুচির পরিচয় দিয়েছেন। যিনি ইতিহাস সচেতন, শিক্ষিত, মার্জিত এবং সাথে তিনি একজন লেখকও বটে। দেখেছি যার লেখার ভক্ত অনেকেই।

ওই রাজনৈতিকের প্রজ্ঞা ও বাচনিক শক্তি দেখে একজন আর্দশবাদী নেতার মতো মনে হয়েছিল। এসবের বাইরেও তার প্রজ্ঞার বিষয়টি গোপন রাখার মতো নয়। হিতে বিপরীত ঘটনা ঘটলো হুট করে যখন একটা দলের প্রতীকে নির্বাচনের জন্য মাঠে নামলেন। সেটাতেও কারো আপত্তি ছিল নাই। এতে করে চেনা মুশকিল হয়ে পড়ছে কোনটা মুখ, আর কোনটা মুখোশ। কেউ দল ত্যাগ করে মহাভারত অশুদ্ধ করেছেন সেটাও নয়। আবার তাকে মনোনয়ন বঞ্চিত করে মহা ভুল করেছে। তা নয়। একজন নেতা নতুন পার্টিতে যোগদানের সময় খুব স্পষ্টভাবে বক্তব্য দিয়েছেন। এক নেতা বলেছেন ‘আমরা যারা রাজনীতি করি সকলের মন-মস্তিষ্কে নির্বাচন, মনোনয়ন পাওয়া এবং এমপি হওয়ার স্বপ্ন থাকে। আমি যদি বলি এই স্বপ্ন ছাড়া এখানে এসেছি, তা হলে এটি ডাহা মিথ্যা কথা।’ তার এই বক্তব্যেই ইনটেনশন প্রতিয়মান  হয়েছে। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, সাংসদ হতে পারলে উচ্চ অংকের মাসিক বেতন? নির্বাচনীয় এলাকার মাসিক ভাতা, সম্মানী ভাতা, কাপড় লন্ড্রির বিল, শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধাসহ মাসিক পরিবহণ ভাতা, নির্বাচনীয় এলাকার অফিস খরচ বাবদ উচ্চ অংকের সম্মানি !

বাসায় টেলিফোন ভাতা, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ বিভিন্ন প্রকল্পের থোক বরাদ্দ ছাড়া আরও অন্যান্য সুযোগে সুবিধার আকাক্সক্ষাতে এত সব লম্ফঝম্ফ? অথচ আমরা রাজনীতির মেনুফেস্টোতে বা নির্বাচনীয় ইশতেহারে উল্লেখ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একেকজন নেতা, জনগণের মহামতি সেবক হয়ে তিনি মহান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সুযোগ চাচ্ছেন। শুরুতেই আমরা এসব নেতাদের ইনটেনশন বুঝে উঠলেও  সাধারণ জনগণ দলত্যাগী স্পষ্ট স্বার্থবাদী নেতাদের বুঝে উঠতে পারে না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে অনেক ক্ষেত্রে পার্টি ককাসকে সন্তুষ্টি করতে রাজনীতির মূল মঞ্চে তাদের গলা ফাটাতে হয়। পরক্ষণেই টকটেবিলে বা আলোচনায় নিজ দলের দোষ ক্রটি স্বীকার করে নিতে হয়। আলোচনার পর সমালোচনাও সহ্য করতে হয়। নেতাদের এসব করতে হয় কনসাস মাইন্ডে। অর্থাৎ লেখার টেবিলে একজন লেখক যেমন নিজস্ব আর্দশ বিসর্জন দিতে পারেন না। একজন  লেখককে ভাবতে হয় তিনি  যে লেখাটি লিখছেন, সেটি অনাগত ভবিষৎতের দলিল। তেমনি একজন মহান রাজনৈতিকের আদর্শ বহন করতে চাইলে দলের বাইরে এসেও দলের অপকর্মের দায় মাথায় ঠুকে নিয়ে কথা বলতে হয়। পথ চলতে হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সফলতার অনেক অন্তরায় রয়েছে। এর মধ্যে  রাজনৈতিক নেতাদের রয়েছে যেমন নীতির পাঠহীনতা। দ্বিতীয়ত ভোটারদের অশিক্ষা ও রাজনীতি সম্পর্কে খোঁজ না রাখা। অর্থনৈতিক অসাম্য। সবশেষে পুরান কথার কচলাতিই শেষ করি। ‘রাজনীতি কোনো পেশার নাম নয়, রাজনীতি কোনো নেশাও নয়। বরং রাজনীতি একটা মহান ব্রত।’
লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৭৫০৯৩৬৯১৯