বেড়ায় যমুনার ভাঙনে কমিউনিটি ক্লিনিকসহ আড়াই শতাধিক বসতবাড়ি বিলীন

বেড়ায় যমুনার ভাঙনে কমিউনিটি ক্লিনিকসহ আড়াই শতাধিক বসতবাড়ি বিলীন

বেড়া (পাবনা) প্রতিনিধি : স্মরণকালের ভয়াবহ নদী ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছে বেড়া চরপেঁচাকোলা গ্রামবাসী। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাব্যাপী চলছে ভাঙনের তান্ডবলীলা। গত ১৫ দিনের ভাঙনে একটি মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ আড়াই শতাধিক বসতবাড়ি যমুনাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, সরকারি বিদ্যালয়, কবরস্থান ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, কবরস্থানসহ অসংখ্য বসতবাড়ি। জানা যায়, উপজেলার চরপেঁচাকোলা গ্রামের পূর্ব প্রান্তে বিশাল চর জেগে উঠেছে। যমুনার স্্েরাতধারা পশ্চিম প্রান্তে সরে এসে সরাসরি চরপেঁচাকোলা গ্রামে আঘাত করছে। এতে দুই কিলোমিটার এলাকাব্যাপী প্রচন্ড ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন এলাকায় পানির গভীরতা দাঁড়িয়েছে ৪০ ফুট। পানি উন্নয়ন বিভাগ ভাঙন এলাকায় ডাম্পিংয়ের জন্য ১৭ হাজার ৬৩৬টি জিও ব্যাগ বরাদ্দ দিয়েছে। একটি মাত্র ট্রলারের সাহায্যে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে ফেলা হচ্ছে।

এতে শুধু টাকার অপচয় হচ্ছে, ভাঙন রোধে কোন কাজেই আসছে না। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ভাঙন রোধের নামে আই ওয়াশ করা হচ্ছে। দুই কিলোমিটার এলাকায় ৮-১০টি গ্রুপে কমপক্ষে ৮০ থেকে ৯০ হাজার বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করতে হবে। তবেই ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে। এদিকে গত ১৫ দিনে চরপেঁচাকোলা গ্রামের ইউনুস ব্যাপারী, নূর মোহাম্মদ, নূর ইসলাম, জাহাঙ্গীর, মজিদ মোল্লা, রফিক মোল্লা, মজিবর মোল্লা, মিজানুর মেম্বর, শিবলু সরদার, নাসিম সরদারের বাড়িসহ প্রায় আড়াই শতাধিক বসতবাড়ি, একটি মাদ্রাসা ও কমিউনিটি ক্লিনিক নদীতে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কবরস্থান থেকে যমুনা নদী কোথাও ১০ ফুট কোথাও বা ১৫ ফুট দূর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই স্থাপনাগুলো যে কোন সময় নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রিতদের মাঝে ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পাবনা-১ (বেড়া-সাঁথিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সামছুল হক টুকু, বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসিফ আনাম সিদ্দিকী, এসি ল্যান্ড মাহবুব হোসেন ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। চরপেঁচাকোলা গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আলহাজ মাওলানা আঃ সোবহান জানান, গত ৫০ বছরে যমুনার এমন ভয়াবহ ভাঙন তিনি দেখেননি। চোখের পলকে ঘর গাছপালা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। চোখে না দেখলে  নদী ভাঙা মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করা যায় না। গত ১৫ বছরে নদী ভাঙনে অনেক গ্রাম, মসজিদ, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাজার হাজার একর ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চরপেঁচাকোলা গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মজিদ মোল্লা। গত এক যুগে দুই দফা নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন। এক সময় ২০ বিঘা জমি ও সাজানো ঘরবাড়ি ছিল তার। এখন কিছুই নেই, সবই যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে। পরিবার পরিজন নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। বেড়া পৌর সদরে শ্রমিকের কাজ করে কোনরকম চলছে তার পাঁচ সদস্যের সংসার। ‘অনেক জমিজমা গাছপালা আছিল এহন আর কিছুই নাই। সর্বনাশা যমুনা নদী আমাগো শেষ সম্বলটুকুও কাইরা নিছে’। এই বলেই কেঁদে ফেললেন মজিদ মোল্লা।

হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড মেম্বর চরপেঁচাকোলা গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, হুড়াসাগর ও যমুনা নদীর মোহনা থেকে ড্রেজার ও ভলগেটের সাহায্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করা না হলে চরপেঁচাকোলা গ্রামের ভাঙন ঠেকানো যাবে না। ভাঙনরোধে বেড়া পাউবো বিভাগ যে পরিমাণ বালু ভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে ফেলেছে তা কোন কাজেই আসছে না। ফলে ব্যাপক ভিত্তিতে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং না করা হলে ভাঙন রোধ সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। বেড়া পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী ভাঙনরোধ প্রকল্পের সাইড ইঞ্জিনিয়র মোঃ ওসমান গনি জানান, চরপেঁচাকোলায় ভাঙনরোধ কাজে ১৭ হাজার ৬৩৬টি জিও ব্যাগ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। জিও ব্যাগে বালু ভরে নদীতে ডাম্পিং করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর আরো বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ব্যাপক ভিত্তিতে ভাঙনরোধ কাজ করা হবে।