বিধিবদ্ধ হলো ওজন ও পরিমাণ মানদন্ড

বিধিবদ্ধ হলো ওজন ও পরিমাণ মানদন্ড

সৈয়দ আহম্মদ কিরণ : গত ২৩/১০/১৮ তারিখে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু জাতীয় সংসদে ওজন ও পরিমাপ দন্ড অধ্যাদেশ ১৯৮২ রহিত করে সময়ের চাহিদার প্রতিফলনে নতুন আইন প্রণয়নে প্রয়োজনীয় বিধান করে সংসদে ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড বিল-২০১৮ উপস্থাপন করেন যা সর্বসম্মতিক্রমে সংশোধিত আকারে পাশ হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তা হিসাবে সময়ের সাথে আইনের এই সংশোধন অত্যন্ত যুগোপযোগি হয়েছে। মানুষ যদি আইন মেনে চলে তাহলে সমাজে ওজন ও মানদন্ড বিষয়ে কোন অরাজকতা থাকবে না। যুগের সাথে তালমিলিয়ে মানুষ আজ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। যেখানে এনালগ সিস্টেম এবং আইন বেমানান। যখন ওজনযন্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ করতে শুরু হল তখন কাজটি ছিল অনেক কঠিন। ২০০৯ সালের কথা বলছি। কেউ বলত আমাদের পূর্ব পুরুষ পাল্লা পাথর দিয়ে পণ্য মেপে ব্যবসা করেছে সেখানে আজ ডিজিটাল স্কেল? সময়ের প্রয়োজেন আজ সেই মানুষই ডিজিটাল স্কেল কিনতে চায়। তাও আবার একাধিক। কারণ এক জায়গার স্কেল দিয়ে অন্য জায়গায় পরিমাপ করলে সময়ের অপচয় হবে। দাড়ি-পাল্লায় মাপলে চোখের দেখায় ওজন নির্ধারণ করতে হত। এনালগ সিস্টেমে ওজন করলে সেটাও আবার চোখের দেখায় নির্ধারিত হত। আজ ডিজিটাল স্কেল ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিটি ডিজিট দেখে ওজন জানা যাচ্ছে। কেজি, গ্রাম, মিলিগ্রাম, লিটার, সেকেন্ড সবকিছু আমরা সূক্ষ্মভাবে দেখতে পাচ্ছি এবং করতে পারছি। সুতরাং সময়ের সাথে আইনের এই পরিবর্তন খুবই মানানসই।

অবহেলিত এই বিভাগে ইতিপূর্বে যে শাস্তির বিধান ছিল তা একেবারেই সামান্য। বিধায় সেখানে অনিয়মের পরিধি বেশি ছিল। ২০১৮ সালে সদ্য পাশকৃত “ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড বিল-২০১৮” এর মাধ্যমে ওজনে কারচুপি ও নিম্নমানের ওজন যন্ত্র ব্যবহার অনেকখানি কমে যাবে। তবে এই আইন সম্পর্কে প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তারপর না মানলে ত প্রয়োগের ব্যাপার আসবে। বিলে আন্তর্জাতিক পদ্ধতির একক হিসেবে পরিচিত এককসমূহ সমগ্র বাংলাদেশে ওজন বা পরিমাপন যন্ত্রের মানদন্ডের মানদন্ড একক হিসেবে ব্যবহারের বিধান করা হয়েছে। তাহলে আন্তর্জাতিক পদ্ধতির এককগুলো কি কি তা আমাদের জানা জরুরি। ওজনের একক কিলোগ্রাম, দৈর্ঘ্যরে একক মিটার, সময়ের একক সেকেন্ড, তরল পদার্থের একক লিটার ইত্যাদি। যেটা বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য এই আইনে বলা আছে। এগুলো ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি কেউ ব্যবহার করলে আইনে দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। যেমন সোনা মাপতে গেলে ভরির পরিবর্তে গ্রাম ব্যবহার করতে হবে, গজের পরিবর্তে মিটার ব্যবহার করতে হবে, আউন্সের পরিবর্তে লিটার ব্যবহার করতে হবে।

 সংশোধিত বিলটিতে সংক্ষিপ্ত আকারে যা বলা হয়েছেঃ “বিলে ভিত্তি একক সমূহের জাতীয় মানদন্ড প্রস্তুত, পরিমাপনের সেকেন্ডারি মানদন্ড একক, প্রচলিত ওজন ও পরিমাপনের মানদন্ডে রূপান্তর, রেফারেন্স মানদন্ড, সেকেন্ডারী মানদন্ড, প্রচলিত মানদন্ড, ওজন বা পরিমাপনের মানদন্ড যন্ত্রসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান করা হয়েছে। বিলে পরিদর্শক কর্তৃক ওজন, পরিমাপন অথবা পরিমাপন যন্ত্র প্রতিপাদন এবং সিলমোহর প্রদান, ওজন পরিমাপন  ও পরিদর্শন এবং সত্যতা প্রতিপাদনের ক্ষমতা, আবদ্ধ মোড়ক ও ধারণাপাত্রের অভ্যন্তরস্থ বস্তু পরিদর্শন এবং প্রতিপাদনের ক্ষমতা, ওজন এবং পরিমাপন উপযোগীকরনের ক্ষমতা, উৎপাদনকারী, মোড়কজাতকারীর রেকর্ড ও দলিলপত্র সংরক্ষণ, মডেল অনুমোদনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিধান করা হয়েছে। এছাড়া বিলে নিবন্ধন সনদ ছাড়া এলপিজি ফিলিং স্টেশন পাম্প থেকে পণ্য লেনদেন করা যাবে না বলে বিধান করা হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য মোড়কজাতকরণ ওজন পরিমাপনের উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানি এবং মোড়কজাতক পণ্যের ব্যবসা সনদ বা নিবন্ধন ব্যতিত করা যাবে না বলে বিধান করা হয়েছে। এছাড়া বিলে মানদন্ডহীন ওজন বা পরিমাপন যন্ত্র অথবা অন্যান্য পণ্যের রপ্তানির অনুমতি শর্তসাপেক্ষে প্রদান করার বিধান করা হয়েছে। পাশাপাশি বিলে মেট্রিক পদ্ধতির ওজন বা পরিমাপন যন্ত্র আমদানি, ইমারত ও স্থাপনা তৈরি বা মেরামত করার ক্ষেত্রে সিডিউলে বা ব্র“সিয়ারে উল্লেখিত পরিমাপন অনুসরণ করার বিধান করা হয়েছে। এছাড়া বিলে স্ট্যাম্পবিহীন বাণিজ্যিক ওজন বা পরিমাপন বিক্রয় বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

লাইসেন্স ছাড়া ওজন বা পরিমাপন যন্ত্র বিক্রি করলে, উৎপাদন করলে এক বছরের কারাদন্ড বা একলাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। অনুমোদন বহির্ভূত বস্তু দ্বারা ওজন বা পরিমাপন তৈরি বা উৎপাদন করলে একলাখ টাকা বা তিন বছরের কারাদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। মানদন্ড ব্যতীত, অন্য কোনও ওজন বা পরিমাপন বা সংখ্যমান ব্যবহার করলে ছয় মাসের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধায় রাখা হয়েছে।

ওজন যন্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হতে ওজন যন্ত্র ক্রয় করতে হবে। ব্যবহারজনিত কোন ত্র“টি হলে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হতে সার্ভিস সেবা গ্রহণ করতে হবে। ওজন যন্ত্র সঠিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু নিয়মাবলী মানা জরুরি। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ওজন যন্ত্র ক্রয় করলে ওজন যন্ত্র ব্যবহারের নিয়মাবলী সেখানে অবশ্যই পাওয়া যাবে। আপনার পণ্য মানেই আপনার টাকা। সুতরাং ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই “ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড বিল-২০১৮” বিল সম্পর্কে সকল শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে জানা উচিত।  
লেখক : প্রাবন্ধিক-শিল্প উদ্যোক্তা
০১৭৩০-০৪১৭০০