পাটের ব্যাগ ব্যবহার নিশ্চিত করুন

পাটের ব্যাগ ব্যবহার নিশ্চিত করুন

মো. ওসমান গনি: সরকারি আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে একটি কুচক্রীমহল পাটের ব্যাগ ব্যবহারের পরিবর্তে এখনও প্লাষ্টিক ও পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করছে। এর প্রভাবে আমাদের পরিবেশ আজ হুমকির মুখে চলে যাচ্ছে। দেশের মানুষ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সরকার প্লাষ্টিক ও পলিথিনের ব্যাগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্লাষ্টিক ও পলিথিনের ব্যাগের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। পাটের বহুমুখী ব্যবহার ও সম্প্রসারণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে পণ্যের মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। আইনে নির্ধারিত ১৯টি পণ্যের মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও দেশের বিখ্যাত কোম্পানিগুলোই এ আইন উপেক্ষা করছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সঠিকভাবে মনিটরিংয়ের অভাবেই এই আইন উপেক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করেন পরিবেশ সংরক্ষণকারীরা। দিনে দিনে পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার যেখানে কমার কথা সেখানে বাড়ছে। ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র অহরহ এ ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। বসুন্ধরা, সিটি গ্রুপের তীর, ফ্রেস, এসিআই, তৃপ্তি, মোরগ মার্কা, সেনাকল্যাণসহ নামিদামি কোম্পানির নির্ধারিত পণ্যগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে না পাটের ব্যাগ। এসব কোম্পানির আটা, ময়দা, চিনি, ভুট্টার ভূষি মোড়কীকরণে ব্যবহার করা হচ্ছে না পাটের ব্যাগ।

 অন্যদিকে সম্প্রতি নতুন করে পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের মোড়কে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতমূলক করা হলেও তা ব্যবহার থেকে দূরে রয়েছে। এছাড়াও চাল, পেঁয়াজ, রসুন, সার, ডাল, মরিচ, হলুদ, ধনিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে না পাটের ব্যাগ। শুধু ধান বাজারজাত করণে এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে চাল বাজারজাতকরণেও কিছু কিছু কোম্পানি পাটের ব্যাগ ব্যবহার করে। তবে প্লাস্টিকের ব্যাগবিশিষ্ট অনেক চাল রয়েছে দেশের বাজারসমূহে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্ধারিত ১৯টি পণ্যের প্রায় সবগুলোই বাজারজাত করছে পাটের ব্যাগ ছাড়া। এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি ও অলসতাকে দায়ী করছে দেশের বিশিষ্টজনরা। আইনে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান এ আইন না মানলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে শাস্তি সর্বোচ্চ দন্ডের দ্বিগুণ হবে। জানা যায়, ২০১৩ সালের ৩ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। সবমিলিয়ে ১৯টি পণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

শুরুর দিকে ছয় পণ্যে ২০ কেজি বা তার বেশি পরিমাণ পণ্য পরিবহণ ও সংরক্ষণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করলেই চলতো। তবে ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বরে সেটি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। তখন যেকোনো পরিমাণ ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি পরিবহণ ও সংরক্ষণে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে কড়াকড়ি করা হয়। জানা গেছে, নতুন করে ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি আগের ৬টি পণ্যের সাথে আরও ১১টি পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। সম্প্রতি পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের সংরক্ষণ ও পরিবহণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। নতুন দুটি পণ্যসহ বর্তমানে ১৯টি পণ্যের ক্ষেত্রে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও আইন আইনের জায়গায় রয়ে গেছে। বাস্তবে এর প্রয়োগ দেখা যায় না মাঠে-ময়দানে। বসুন্ধরা গ্রুপের ৫০ কেজির চিনি বস্তা, তীরের ৫০ কেজি আটা, ময়দা, চিনি, ফ্রেসের আটা, ময়দা, চিনিসহ চাল, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, গম, ভুট্টা, ভুট্টার ভূষিসহ নির্ধারিত পণ্যের অধিকাংশতেই ব্যবহার হচ্ছে না পাটের ব্যাগ। এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে পরিবেশ ধ্বংসকারী প্লাস্টিক ও পলিথিনের বস্তা। এছাড়াও পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডের মোড়কীকরণে ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাস্টিক বস্তা।

এ ব্যাপারে পোল্ট্রি ফিশ শিল্প মালিক সমিতির সদস্যরা পাটের ব্যাগ ব্যবহারে দেখাচ্ছে খোঁড়া যুক্তি। তাদের ভাষ্য, পাটের বস্তা ব্যবহারে খাবারের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন পাটের বস্তায় যে ছিদ্র থাকে তা দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে। ফলে এর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করছে না। আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তারা বলেন, এই আইন করার পূর্বে আমাদের সাথে কথা বলা হয়নি। আমরা আইন করার পর এর প্রতিবাদ জানিয়েছি। আশা করছি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারটা বিবেচনা করবেন। পোল্ট্রি বা ফিশের খাবারে পাটের বস্তা ব্যবহার করলে এর গুণগতমান ঠিক থাকবে না বলে তারা অভিযোগ করেন।তবে তাদের একথার সাথে একমত হতে পারেননি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দাবি, মাঠে মোবাইল কোর্ট চলছে। আইন কার্যকরের ব্যাপারে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়া হবে। এই আইনের আওতায় ১৯টি পণ্য হচ্ছে মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনে, আলু, আটা, ময়দা, তুষ-খুদ-কুঁড়া, ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি পোল্ট্রি ফিড ও ফিশ ফিড। এসব পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আরও ব্যাপকহারে পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্টজনরা। এসব পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহার শত ভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান, দেশের সচেতন মহল। দেশের প্রতিটি হাট-বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। আর যে সমস্ত কোম্পানি সরকারের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে মানুষ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এদেশ আমার ও আপনার সকলের। দেশের মানুষ ও পরিবেশকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব। এ ব্যাপারে আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯