পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন সিনথেটিকের ব্যবহার বন্ধ করুন

পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন সিনথেটিকের ব্যবহার বন্ধ করুন

আব্দুল হাই রঞ্জু : এক সময় পাট ছিল কৃষকের অর্থকরী ফসল। ছিল দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত। পাটকে বলা হতো বাংলার সোনালি আঁশ। কেবল স্বর্ণের মতো রংয়ের কারণে নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত হওয়ায় পাটকে সোনালি আঁশ বলা হতো। কালের বিবর্তনে, ক্ষমতাসীনদের ভ্রান্ত পাটনীতির কারণে এবং দুর্নীতি লুটপাটের শিকার হয়ে পাট হয়েছিল কৃষকের গলার ফাঁস। মূলত পাটের ন্যায্য মূল্যের অভাবে স্বাধীনতা উত্তর পাট চাষীরা পাটের চাষ ছেড়েই দিয়েছিল। স্বাধীনতাপূর্ব তৎকালিন পাকিস্তান আমলে পাটের যে কি পরিমাণ কদর ছিল, যা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আবার আমাদের চোখের সামনে পাটের সুদিনও হারিয়ে গিয়েছিল। ফলে দেশের স্থাপিত পাটকলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অথচ কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় পাটকলগুলো দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট না হলে হয়ত পাটের ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি স্বাবলম্বি হতে পারতো। স্বাধীনতার পর পর পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আসত রফতানি আয়ের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। অথচ শুধু লুটপাটের কারণে পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিককে কাজ হারাতে হয়েছিল। এমনকি বিএনপি সরকার বিদেশীদের প্রেসক্রিপশনে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজিকে এক পর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে চিরচেনা পাটকল থেকে চোখের পানি ফেলে বিদায় নিতে হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারিকে। যে মুহূর্তে বিদেশিদের প্রেসক্রিপশনে দেশের সর্ববৃহৎ পাটকলকে ধ্বংস করা হয়েছে, সে মুহূর্তে প্রতিবেশি দেশ ভারতে পাট শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ ঘটেছে। ভারত এখন পাট শিল্পে সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে বিশ্বের মানচিত্রে।

আমাদের দেশে চাষীরা যেটুকু পাট চাষ করেছে, তা দেশীয়ভাবে বিক্রির তেমন কোন সুযোগ না থাকায় সে পাট দেদার ভারতে পাঁচার হয়েছে। আমাদের দেশের পাটচাষীরা পাটের ভাল দাম পাওয়ায় পাট চাষের আগ্রহও বাড়তে থাকে। আবার এরই মধ্যে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে পাটের চাষাবাদ বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করে। ‘পণ্যে পাটজাত মোড়ক’ কর্মসূচি গ্রহণ করে পরিবেশ বিধ্বংসী প্লাস্টিক ও সিনথেটিক পণ্যের বিকল্প হিসেবে পাটের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া শুরু করে। যদিও স্বাধীনতা উত্তর দীর্ঘ সময়ে পণ্যের মোড়কে প্লাস্টিক, সিনথেটিক ও পিপি ব্যাগের ব্যবহার সে হারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইচ্ছা করলেও তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হচ্ছে। ইতিমধ্যেই দেশে পাটের বদলে পলিথিন, সিনথেটিক, পিপি ব্যাগ প্রস্তুতে ছোট বড় কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এ খাতে ব্যাংকের পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে। হঠাৎ করে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান যেমন একেবারে বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কারখানা বন্ধ করতে না পারলে সরকার পণ্যে পাটজাত মোড়কের শতভাগ ব্যবহারকেও নিশ্চিত করতে পারবে না। অপ্রিয় হলেও এটাই বাস্তবতা। ইতিমধ্যে সরকার চালসহ ১৭টি পণ্যে পাটজাত মোড়ক নিশ্চিত করতে আইন করে কার্যকরের চেষ্টা করছে। শুধু চালের ক্ষেত্রেই নয়, চিনি, আটা, সার, মসলা জাতিয় পণ্যের পাটজাত মোড়ক ব্যবহারের আইন করলেও তা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারছে না। যদি পলিথিন, সিনথেটিক ও পিপি ব্যাগ প্রস্তুত প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তাহলে কোনভাবেই পাটজাত মোড়কের ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এজন্য পর্যায়ক্রমে পরিবেশ বিধ্বংসী এসব পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি এসব পণ্য উৎপাদনে ব্যাংক কিম্বা অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ প্রদান বন্ধ করতে হবে। সাথে সাথে পাটজাত পণ্যে মোড়কের ব্যবহার বাড়াতে স্বল্প সুদে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের ব্যবস্থা করে পাটের মোড়ক প্রস্তুতের জন্য যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তা না করে শুধু শুধু মোড়কে পাটজাত পণ্যের শতভাগ ব্যবহারকে কস্মিনকালেও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

অবশ্য এখন পাটপণ্যের ব্যবহার গোটা বিশ্বে ফিরতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সচেতন মানুষ পরিবেশ বিধ্বংসী প্লাস্টিক ও সিনথেটিক পণ্য ব্যবহার দিনে দিনে কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও এখন সেই হাওয়া লেগেছে। এক সময় বাংলাদেশের পাটের বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল ভারত, চীন ও পাকিস্তান। বর্তমানে সেই বাজার বিস্তৃত হয়েছে প্রায় ৬০টি দেশে। আবার নতুন নতুন বাজারের সন্ধানও মিলছে। সবমিলে এখন পাটের সুদিন ফিরতে যে শুরু করেছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। পাটের ওপর নিরবচ্ছিন্ন গবেষণায় পাটের জীন উদ্ভাবিত করতে বিজ্ঞানীরা সক্ষম হয়েছেন। এখন পাট থেকে প্রায় ২৮৫ ধরনের পাটপণ্য দেশে বিদেশে বিক্রি করছে, বাংলাদেশে যখন দুর্দিন কাটিয়ে পাটের সুদিন ফিরতে শুরু করেছে, তখন সরকারের অর্থমন্ত্রণালয় ও পাট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম অভিযোগ করেন, পাটের বিকাশে বাধা অর্থমন্ত্রী, পাট পণ্যের প্রসার অর্থ মন্ত্রণালয় আটকে রেখেছে। প্রতিমন্ত্রীর এ মন্তব্যের দুই দিন পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, সরকারের লোকসানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন বা বিজেএমসিকে একেবারে বন্ধ করে দেয়া উচিত। অর্থমন্ত্রীর অভিযোগ হচ্ছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় বিজেএমসির খপ্পরে পড়েছে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পাটকে আমরা রিভাইস করতে চাই। পাটের নতুন নতুন বাজারও সৃষ্টি হচ্ছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ের রিভিশনের প্রক্রিয়াটা আমার ভালো লাগছে না। হয়তো অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্যের পিছনে যৌক্তিক কোন কারণ থাকতেই পারে। কিন্তু আমরা মনে করি, সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আন্ত: মন্ত্রণালয় বৈঠক করে দুর্বল দিকগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খোঁজা উচিত। কিন্তু সম্ভাবনাময় পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রসারে দুই মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের মন্তব্যে হতাশারই প্রতিফলন ঘটছে। আমাদের দেশে এখনও অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাটের মত ঘটনা যে ঘটছে না, তা নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারবেন না। এজন্য যেমন মাথা ব্যথা হলে তা উপশমে ওষুধ প্রয়োগ না করে কেউ মাথা কেটে ফেলে না, তেমনি পাটকল কর্পোরেশনের অনিয়ম দুর্নীতি, থাকলে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়াই হবে, যৌক্তিক ও সময়োচিত। তা না করে কেবল একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেই থাকলে সম্ভাবনাময় পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রসারের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা বাড়তেই থাকবে।

আগেই বলেছি, সরকার ১৭টি পণ্যে মোড়কজাতের “ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট” বাস্তবায়ন করার পাটের বস্তার অভ্যন্তরীণ বাজার বেড়েছে কয়েকগুণ। এ আইনের শতভাগ প্রয়োগকে নিশ্চিত করা সম্ভব হলে পরিবেশ বিধ্বংসী সিনথেটিকের আগ্রাসন হতে জাতিকে মুক্তা করা সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, পাট থেকে মিহি কাপড় তৈরির গবেষণায় দেশের বিজ্ঞানীরা অনেক দুর এগিয়ে গেছেন। এমনকি স্বাস্থ্যসম্মত পাট পাতার তৈরি চা রফতানি শুরু হয়েছে জার্মানিতে। হয়তো পাটের পাতার চা গোটা বিশ্বে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে। পাটের তৈরি ব্যাগের কদর এখন গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে। এ ছাড়াও অন্যান্য পাটজাত পণ্যের বাজার প্রতিনিয়তই সম্প্রসারিত হচ্ছে। মনে হয়, এক সময়ের “সোনালি আঁশ” আবার সম্ভাবনার ভাগ্য দুয়ারকে খুলে দিতে পারে। হয়ত নিকট ভবিষ্যতে এর ব্যাপকতা ঈর্ষনীয় পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হবে। সেহেতু আমাদের ছোট্ট দেশটির জনসংখ্যার চাপ প্রতিনিয়তই বাড়ছে, সেহেতু মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যখন পাটের চাষাবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে, তখন ধানের চাষাবাদের পরিমাণ কমে আসবে। ফলে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে পাট বিজ্ঞানীরা লোনা পানি সহিংস জাতের পাট উদ্ভাবনে গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। আমরা আশাবাদি, লোনা পানি সহনীয় পাটের জাত উদ্ভাবন হলে পাট চাষের জন্য নতুন পরিধি নিশ্চিত হবে। তখন আর ধান, গম সহ কৃষি পণ্য চাষাবাদের ওপর নেতিবচক প্রভাব পড়বে না। এখন সুবিশাল সমুদ্র উপকুলীয় অঞ্চলে শুধু লোনা পানির কারণে কৃষির চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। তবে আমরা আশাবাদি, দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা যেহেতু ইতিমধ্যেই লোনা পানি সহনীয় ধানের জাত উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন, সেহেতু নিকট ভবিষ্যতে লোনা পানিতে পাটের চাষাবাদকে নিশ্চিত করার মতো উদ্ভাবনী সফলতা অর্জিত হবেই। উপসংহার শুধু এটুকুই বলতে চাই, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের বিপুল চাহিদা থাকা সত্ব্ওে নানাবিধ কারণে পর্যাপ্ত রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এরপরও বিশ্ববাজারে এ খাতের রফতানির পরিমান সম্প্রসারিত হচ্ছে। সম্ভাবনাময় এ খাতের সমৃদ্ধি অর্জনে সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে যেন নতুন কোন সংকটের জন্ম না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে এটুকু নিশ্চিত করা বলা সম্ভব হবে, এক সময়ের সোনালি আঁশের সুদিন আবার ফিরে আসবে, সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮